সারা বছর ফুটবল অনুরাগীরা মেতে থাকেন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল নিয়ে। ৪ বছর পর পর ওয়ার্ল্ডকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশের ফুটবলপাগল মানুষ ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত হন। ফুটবল হয়ে ওঠে সবার ধ্যান-জ্ঞান। অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাট, বাজার, রেস্টুরেন্ট আর চায়ের আড্ডার প্রধান বিষয়ই হয়ে যায় ফুটবল। সব বয়সের মানুষ মেতে ওঠেন মর্ত্যের এ বৃহৎ ক্রীড়া যজ্ঞে। গেস্ট রুম, ড্রয়িং রুম ছাপিয়ে বেডরুম এমনকি রান্নাঘরেও ঢুকে পড়ে ফুটবল।
Advertisement
বিশ্বকাপ ফুটবলের ডঙ্কা বাজতে শুরু করেছে কদিন আগে থেকেই। আজ ভোরে মাঠে নেমেছিল খেলাপ্রেমী বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম প্রিয় দল ব্রাজিল। অনেকেই রাত জেগে খেলা দেখেছেন। সব মিলিয়ে ফুটবলময় চারপাশ। এরকম পরিবেশ-প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ। টাইগাররা জিতলে অসিরা হবে ‘বাংলাওয়াশ’। আর বাংলাদেশ হারলে সিরিজ হারা অসিরা অন্তত হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর স্বস্তিটা পাবে।
এমন এক সমীকরণ সামনে রেখে খানিকটা বিস্ময়করভাবে রোববার ম্যাচ দেখতে প্রায় ১২/১৩ হাজার ক্রিকেট অনুরাগী উপস্থিত হয়েছিলেন শেরেবাংলায়। কিন্তু তাদের প্রায় ৪০ ভাগ খেলা শেষ হওয়ার প্রায় আধঘণ্টা আগেই মাঠ ছাড়েন। তারা এমনি এমনি স্টেডিয়াম ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেননি।
ততক্ষণে ম্যাচ যে অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। শেষ ৩০ বলে ইনিংসের অর্ধেকটা হাতে থাকতে অসিদের দরকার ছিল ৯ রানের। একপ্রান্তে ওপেনার, সেঞ্চুরিয়ান কনোলি। খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া হয়তো ৪-৫ উইকেটে জিতে যাবে। হয়তোবা আর ১/২ ওভারের মধ্যেই খেলা শেষ হয়ে যাবে।
Advertisement
ম্যাচের যা অবস্থা ছিল, তাতে সেটা হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কারণ ৫ ওভারে ৯ রানের লক্ষ্যর ঠিক আগের ওভারে (৪৫ নম্বর ওভারে) টাইগার ফাস্টবোলার তাসকিন আহমেদের এক ওভারে ৩ ছক্কা হাঁকিয়ে খেলার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন অসি ওপেনার কুপার কনোলি।
কিন্তু ঠিক তার পরপরই ভোজবাজির মতো পাল্টে যায় ম্যাচের চালচিত্র। ৪৬ নম্বর ওভারেই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। ওই ওভারে অসিদের দুই লোয়ার অর্ডার অলিভার পিক ও জেভিয়ার বার্টলে ফিরে যান শরিফুলের বলে। শুধু ২ উইকেটের পতন ঘটানোই নয়, ওই ওভারে মোটে ১ রান দেন শরিফুল।
তার পরের ৪ ওভারেও টাইট বোলিং করেন মোস্তাফিজুর রহমান আর শরিফুল। মোস্তাফিজের করা ৪৭ নম্বর ওভারে রান ওঠে মাত্র ৩।
তারপরও হিসাব ছিল পানির মতো সহজ। ৩ উইকেট হাতে রেখে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ৫ রানের। কিন্তু ৪৮ নম্বর ওভারে শরিফুল নিজের শেষ ওভারটি করতে এসেও দারুণ বোলিং করেন। সেই ওভারটিতে কোনো রান না দিয়ে মেডেন উইকেট (বেন ডরসিসের উইকেট) নেন।
Advertisement
তখন ১২ বলে ৫ রান দরকার থাকা অবস্থায় বোলিংয়ে এসে মোস্তাফিজও দারুণ মাপা ও সমীহ জাগানো বোলিং নৈপুণ্য দেখান। এবং একদিকে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা কনোলিকে বোল্ড করে খেলায় উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়িয়ে দেন।
এতে করে শেষ ওভারে ১ উইকেট হাতে থাকা অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন পড়ে ৩ রানের। কিন্তু তাসকিন আহমেদ এসে তৃতীয় বলে অসি লেগি জাম্পার কাছে বাউন্ডারি হজম করলে উবে যায় বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন।
শেষ পর্যন্ত জিততে না পারলেও শেষ ৫ ওভারে বাংলাদেশের ২ ফাস্টবোলার শরিফুল আর মোস্তাফিজ বুকভরা সাহস নিয়ে, মাথা ঠান্ডা রেখে বুদ্ধি খাটিয়ে বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাব্য সহজ জয়ের পথকে যেভাবে সুকঠিন করে তুলেছিলেন, সেটা যারা দেখেছেন, নিশ্চয়ই তাদের স্মৃতিপটে বহুদিন জাগরুক থাকবে।
৩০ বলে ৫ উইকেট হাতে রেখে মাত্র ৯ রান ডিফেন্ড করতে গিয়ে বাংলাদেশের বোলাররা যে দুর্দান্ত লড়াইয়ের মানসিকতা দেখালেন। পাশাপাশি কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় না গিয়ে আলগা বল না করে যেভাবে অসি ব্যাটারদের নাকানি চুবানি খাওয়ালেন, সেটা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কামব্যাক ও হাতে গোনা ৯ রান ডিফেন্ড করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের ভিত কাঁপিয়ে জয়ের হাত মেলানো দূরত্বে পৌঁছে যাওয়ার নজির আর একটিও নেই। শেষ পর্যন্ত ১ উইকেটে হারলেও ১৪ জুন শেরেবাংলায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে শেষ মুহূর্তের মরণপণ লড়াই ইতিহাসের পাতায়ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আগামীতে এ ম্যাচের শেষ ৪ ওভার অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে।
এআরবি/এমএমআর