২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে উড়ন্ত সূচনা পায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের দরকার ছিল একটি ব্রেক থ্রু, ম্যাচে ফেরার মতো কিছু। তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান যখন সেই কাজটা করতে পারছিলেন না, তখন অধিনায়ক ভরসা রাখেন একাদশে ফেরা শরিফুল ইসলামের ওপর। আর শরিফুল যেন অপেক্ষাতেই ছিলেন। নিজের প্রথম ওভারেই তুলে নেন দুই উইকেট।
Advertisement
তবু অস্ট্রেলিয়ার দাপট ঠিকই ধরে রেখেছিল। কুপার কনোলির দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে সফরকারীরা এগিয়ে যাচ্ছিল সহজ জয়ের দিকেই। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল অলৌকিক কিছু। আবারও সামনে এলেন শরিফুল। ইনিংসের শেষভাগে আরেক ওভারে তুলে নিলেন জোড়া উইকেট, ম্যাচে ফিরিয়ে আনলেন বাংলাদেশকে।
ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার করেন এই বাঁ-হাতি পেসার। তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও শরিফুলের পারফরম্যান্সের আলাদা মূল্য আছে। পুরো সিরিজে একাদশের বাইরে থাকার পর সুযোগ পেয়েই তিনি দেখিয়েছেন, দলের প্রয়োজনে নিজেকে নিংড়ে দিতে সবসময় প্রস্তুত। একসময় যে ম্যাচ একপেশে মনে হচ্ছিল, শরিফুলের আগুনঝরা স্পেলে সেটিই পরিণত হয় রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জয় না পেলেও শরিফুল নিজের লড়াকু মানসিকতা আর অসাধারণ বোলিংয়ে সমর্থকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, সিরিজে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই তিনি হয়ে গেলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো একটি ব্যক্তিগত অর্জন, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় বার্তা- সুযোগ পেলে শরিফুল এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ম্যাচজয়ী পেসারদের একজন।
Advertisement
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে প্রতিযোগীতার শেষ নেই। দুর্দান্ত বোলিং করেও অনেক সময় জায়গা হচ্ছে না একাদশে। শরিফুলের কথাই ধরুন না! গত মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে পুরো সিরিজ জুড়েই বসে ছিলেন ডাগআউটে। নিউজিল্যান্ড সিরিজে খেলা ৩ ম্যাচে নিয়েছেন ৫ উইকেট। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে আবার তার জায়গা ডাগআউটে।
টানা ২ ম্যাচ জিতে সিরিজ আগেই জিতে যাওয়ায় শেষ ম্যাচে বিশ্রামের বিলাসিতা করার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। সেটাই করলো স্বাগতিকরা, অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের বুকে কাপন ধরানো নাহিদ রানাকে তৃতীয় ম্যাচে দেওয়া হলো বিশ্রাম। আগের দুই ম্যাচ বাইরে থাকা শরিফুল যেন এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিলেন। সুযোগ কিভাবে লুফে নিতে হয় সেটা দেখালেন বল হাতে।
১০ ওভার বোলিং করে নেন ৪৮ রানে ৬ উইকেট। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটাই তার সেয়া বোলিং ফিগার। বাংলাদেশের জার্সিতে এটা পঞ্চম সেরা বোলিং ফিগার। অবশ্য মিরাজ ছাড়া আর ওয়ানডে ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়েছেন আর ৪ জন, মাশরাফি বিন মুর্তজা, রুবেল হোসেন, রিশাদ হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৮ রান খরচ করেছেন শরিফুল আর সবচেয়ে কম ২৬ রান খরচ করেছেন মাশরাফি।
ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার কোনোলি থেকে বাংলাদেশ অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ প্রশংসায় ভাসিয়েছেন শরিফুলকে। মিরাজের চোখে বেঞ্চে বসা খেলোয়াড়দের ক্ষুধা আছে বলেই এমন পারফর্ম্যান্স করতে পারছেন।
Advertisement
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘শরিফুল গত সিরিজেও ভালো বোলিং করেছে, আজও দারুণ করেছে। আমার মনে হয় আমাদের বোলিং ইউনিটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সবার মধ্যেই নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষুধা আছে। যে যখনই সুযোগ পাচ্ছে, সে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং দলের জন্য অবদান রাখতে চাইছে।’
মিরাজের চোখে শরিফুলদের এমন মানসিকতা দলের ফলাফলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, ‘আমার কাছে এটা দলের জন্য খুবই ইতিবাচক একটি দিক। এমন মানসিকতা দলের ফলাফলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি দলে যদি এমন বোলিং ইউনিট থাকে, তাহলে ম্যাচ জেতার সুযোগও অনেক বেড়ে যায়। আমাদের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। সিরিজের শুরুতে নাহিদ রানা খেলেছে এবং খুব ভালো বোলিং করেছে। শরিফুল হয়তো নিয়মিত সুযোগ পায়নি, কিন্তু সুযোগ পেয়েই সে দেখিয়ে দিয়েছে যে ভালো জায়গায় বল করে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেওয়ার সামর্থ্য তার আছে।’
অন্যদিকে ১৪৯ রান করা কোনোলিও ম্যাচ শেষে বললেন শরিফুলকে সামলানো কঠিন ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সৌভাগ্যবান যে ওর বিপক্ষে ইনিংসের শুরু থেকেই খেলতে পেরেছি। পুরো ইনিংসেই ওকে মোকাবিলা করেছি। তবে আমার মনে হয়, নতুন কোনো ব্যাটারের জন্য ওকে সামলানো বেশ কঠিন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ বেশ শক্তিশালী। আজ রাতেও সে দারুণ বোলিং করেছে। আমাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে এবং অনেক সময় রান করা কঠিন করে তুলেছে। সে আক্রমণাত্মক ছিল, উইকেট নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই বল করেছে।’
ইনিংসের পঞ্চম ওভারে প্রথম আক্রমণে আসেন শরিফুল। রান তাড়ায় আগের ৪ ওভারে ৪০ রান তুলে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া। আক্রমণে এসে ওভারের দ্বিতীয় বলেই ১২ বলে ২১ রান করা অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক জস ইংলিশকে ফেরান শরিফুল। এক বল বাদে উপড়ে ফেলেন ম্যাট রেনশর উইকেট।
উইকেটে জমে গিয়েছিল কুপার কোলোনি ও মার্নাস লাবুশানের জুটি। ব্রেক থ্রু প্রয়োজন, আবার ত্রাতা শরিফুল! আক্রমণে ফিরেই লিয়াম লিভিংস্টোনকে উইকেটের পিছনে ক্যাচ বানিয়ে ভাঙেন ৫৪ রানের জুটি। শেষ ৫ ওভারে ৫ উইকেট হাতে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য প্রয়োজন মাত্র ৯ রান। এমন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র অলৌকিক কিছুই ফিল্ডিং দলকে ম্যাচ জেতাতে পারে। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত না জিতলেও শরিফুল ঠিকই নিজের জায়গা থেকে অলৌকিক ঘটনাই ঘটালেন!।
৪৬তম ওভারে আক্রমণে এসে জোড়া আঘাত হানেন শরিফুল। সেঞ্চুরিয়ন কোনোলির সঙ্গে মিলে ম্যাচটা শেষ করার পথে ছিলেন পিক। তাঁকে ফেরান শরিফুল। উড়িয়ে মারতে গিয়ে পিক কাভারে ক্যাচ দিলেন রিশাদকে, ফেরেন ৩২ বলে ২৭ রান করে । পরের বলেই জাভিয়ের বার্টলেটকের উইকেট উপড়ে দেলেন শরিফুল। বাংলাদেশ তখন নিশ্চিত হারতে যাওয়া ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছে।
এক ওভার পর আক্রমণে এসেই আবার উইকেট নিলেন শরিফুল। এবার তার শিকার হয়ে ফেরেন ডোয়ারশিস। এক বল পরই অ্যাডাম জাম্পাকেও ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন শরিফুল। তার করা অফ স্টাম্পের বাইরে করা ডেলিভারি স্কয়ার কাট করতে চেয়েছিলেন জাম্পা, টাইমিং না হওয়ায় সেটা চলে যায় দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা তানজিদ তামিমের হাতে!
কিন্তু সবাইকে অবাক করে সেই ক্যাচ ধরতে ব্যর্থ হন তিনি। শরিফুল তো বটেই, পুরো দল তখন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে মাটিত! হয়তো সবার মনে একটাই লাইন ছিল তখন ‘তামিম, ম্যাচটাই বোধহয় ফেলে দিলি।’ শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে। পরের ওভারে মোস্তাফিজ ১৪৯ রান করা কোনালিকে তুলে নিলেও শেষ ওভারে চার মেরে দলের জয় নিশ্চিত করেন শূন্য রানে জীবন পাওয়া জাম্পা।
এসকেডি/আইএইচএস/