জাতীয়

এক জেলায় অপরাধ, অন্য জেলায় আত্মগোপন

অপরাধ সংঘটনের পরপরই যেন মিলিয়ে যায় তাদের উপস্থিতির সব চিহ্ন। এক জেলায় অপরাধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে দ্রুত আশ্রয় নেন অন্য জেলা কিংবা শহরে। পরিচয় গোপন, অবস্থান পরিবর্তন আর কৌশলী চলাফেরার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে আত্মগোপনে থাকেন অপরাধচক্রের সদস্যরা।

Advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে এমন একটি প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে গ্রেফতার এড়াতে অপরাধীরা অপরাধের স্থান থেকে অনেক দূরে গিয়ে আত্মগোপন করছেন।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, দিন দিন উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধীরা অপরাধপরবর্তী যেখানেই গাঢাকা দিক না কেন দ্রুত তাদের অবস্থান শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

আরও পড়ুন পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার হবে পিটি-প্যারেডে

গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন এমন ২৪৩ আসামিকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন। রাজধানী ও ঢাকার বাইরের অপরাধীদের পারস্পরিক আশ্রয়স্থল বদলালেও প্রযুক্তিনির্ভর অভিযানে তাদের আইনের আওতায় আনছে বাহিনীটি।

Advertisement

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবী এলাকায় সাত বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দ্রুত অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় আসামি সোহেল রানাকে (৩৪)।

সাধারণত মোহাম্মদপুর ও বসিলা এলাকাকেন্দ্রিক যে ছিনতাই হয় সেসব আসামি আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় লুকিয়ে যান। এটা নতুন কোনো সমস্যা নয়। সারাদেশেই যত অপরাধ হয় এরপর সব অপরাধী পালিয়ে বাঁচতে বিভিন্ন এলাকায় গাঢাকা দেয়।-ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন 

এর কিছুদিন যেতে না যেতেই ৩১ মে দিনগত রাত ৩টা ৪০ মিনিটে ঘটে আরেক ঘটনা। ঠাকুরগাঁও থেকে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরেন দুই বোন। মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোড এলাকায় বাসার সামনে মালামাল নিয়ে নামার পর একটি পিকআপে করে আসা তিন ব্যক্তি তাদের চাপাতি দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যান সবকিছু। এ ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে ঘটনায় জড়িত প্রধান অভিযুক্ত দুই আসামিকে নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়, পেশাদার ছিনতাইকারীদের এই চক্রের সদস্যরা এক সময় মোহাম্মদপুরে থাকতেন। তবে গ্রেফতার এড়াতে নারায়ণগঞ্জে নতুন আস্তানা গাড়েন। নারায়ণগঞ্জ থেকে মোহাম্মদপুরে এসে নিয়মিত ছিনতাই করতেন তারা।

Advertisement

এ ঘটনার কিছুদিন যেতে না যেতেই ৮ জুন (সোমবার) রাজধানীর রমনার মৌচাক এলাকায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের বিল্লাল হোসেন তালুকদার (৪৫) নামের এক নেতাকে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করা হয় আসামি রিয়াজকে।

অপরাধীরা শুধু ঢাকায় এসব অপরাধ করে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে গাঢাকা দিচ্ছেন তা নয়। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর অপরাধীরাও নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে রাজধানীতে এসে গাঢাকা দিচ্ছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়।

আরও পড়ুন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক নির্মূল করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গত ২০ মে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানা এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি ট্রাক রাস্তার ওপর পাওয়া যায়। ওই ট্রাকের ভেতরে ছিল অর্ধগলিত একটি মরদেহ। মরদেহটি ছিল আবদুর রহমান (৫৮) নামে এক ব্যক্তির। মাগুরার মেসার্স মহামায়া ট্রেডার্স নামের একটি কোম্পানির মালিকের চালক ছিলেন তিনি। মূলত ১৯ লাখ টাকা মূল্যের ৬০ ব্যারেল ভোজ্যতেল ছিনিয়ে নিতেই খুন হন তিনি।

যে জায়গার যে মামলা হোক না কেন, আসামিদের শনাক্ত করার টেকনোলজি আমাদের আছে। সেই হিসেবে আমরা বুঝতে পারি আসামি কোথায় আছেন। অবস্থান শনাক্ত করে ওই এলাকার ব্যাটিলিয়নকে কানেক্ট করি। এরপর কোনো অপরাধী ঢাকায় অপরাধ করে ঢাকার বাইরে গাঢাকা দিলে বা ঢাকার বাইরে অপরাধ করে ঢাকায় গাঢাকা দিলে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।-র‍্যাব-৪ এর সদর কোম্পানি কমান্ডার মেজর শেখ আরমান হোসাইন হৃদয়

এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী ওয়াহিদুল ইসলামকে (৩৬) সাভার থানাধীন পলাশ মার্কেট এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-৪।

আরও পড়ুন ট্রাকচালককে হত্যা করে তেল ছিনতাই, বিক্রি করে প্রতারিত আসামিরাও

ধারাবাহিকভাবে ঘটা এসব ঘটনার পর্যালোচনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, রাজধানীর অপরাধীরা ঢাকার মধ্যে অপরাধ করে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে গাঢাকা দিচ্ছেন। আর ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর অপরাধীরা অপরাধ করে আত্মগোপনে থাকছেন রাজধানীতে।

অপরাধ দমনে র‍্যাবের একটি ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ করে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে আত্মগোপন করা ২৪৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-৪। তাদের মধ্যে হত্যা মামলার ৯৮ জন, ধর্ষণ মামলার ৪৫ জন, সাজাপ্রাপ্ত ৪৯ জন, অপহরণ মামলার ২৫ জন, দস্যুতার ১০ জন, ডাকাতির ৯ জন, প্রতারণার দুজন এবং চুরির একজন আসামি রয়েছেন। এছাড়া এজাহারনামীয় একজন, ছিনতাইকারী একজন, মানবপাচারকারী একজন ও জাল টাকা প্রস্তুতকারী একজনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন র‍্যাব আগের মতো থাকছে না: ডা. জাহেদ উর রহমান

ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাধারণত মোহাম্মদপুর ও বসিলা এলাকাকেন্দ্রিক যে ছিনতাই হয় সেসব আসামি আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় লুকিয়ে থাকেন। এটা নতুন কোনো সমস্যা নয়। সারাদেশেই যত অপরাধ হয় এরপর সব অপরাধী পালিয়ে বাঁচতে বিভিন্ন এলাকায় গাঢাকা দেন।’

র‍্যাব-৪ এর সদর কোম্পানি কমান্ডার মেজর শেখ আরমান হোসাইন হৃদয় জাগো নিউজকে বলেন, যে জায়গার যে মামলা হোক না কেন, আসামিদের শনাক্ত করার টেকনোলজি আমাদের আছে। সেই হিসেবে আমরা বুঝতে পারি আসামি কোথায় আছেন। অবস্থান শনাক্ত করে ওই এলাকার ব্যাটিলিয়নকে কানেক্ট করি। এরপর কোনো অপরাধী ঢাকায় অপরাধ করে ঢাকার বাইরে গাঢাকা দিলে বা ঢাকার বাইরে অপরাধ করে ঢাকায় গাঢাকা দিলে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

কেআর/এমআইএইচএস/এএসএ/এমএফএ