সম্প্রতি দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। গ্রেফতারের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত তারে সেই ডুপ্লেক্স বাড়িটি নিয়ে ফের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
Advertisement
জানা গেছে, সম্প্রতি দুবাই বিমানবন্দরে গ্রেফতার হন বেনজীর আহমেদ। লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডগামী একটি ফ্লাইটে যাত্রা করছিলেন বেনজীর আহমেদ। পরিকল্পনা ছিল দুবাইয়ে ট্রানজিট শেষে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর। তবে দুবাই বিমানবন্দরের এআইভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্ক্যানিং সিস্টেমে তার মুখমণ্ডল শনাক্ত হয় এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধীদের ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে ইন্টারপোলের সতর্কতা সংকেত সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরে দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় ইউনিট বিষয়টি যাচাই করে তাকে হেফাজতে নেয়। প্রযুক্তিগত শনাক্তকরণের পরপরই নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।
২০২২ সালের দিকে উপজেলার পূর্বাচলের দক্ষিণবাগ এলাকায় গুতিয়াব মৌজায় অবস্থিত ‘আনন্দ হাউজিং সোসাইটি’র ছয়টি প্লটের ২৪ কাঠা জমির ওপর ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের হিসাব গোপন ও অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা হয়।
আরও পড়ুন এবার বেনজীরের ডুপ্লেক্স বাড়ি জব্দ২০২৪ সালের ২৩ মে আদালতের আদেশে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ৮৩টি দলিলের সম্পত্তি ও ৩৩টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। এছাড়া ২৬ মে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামের ১১৯টি জমির দলিল, ২৩টি কোম্পানির শেয়ার ও গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেন আদালত। ২৩ মে তাদের নামীয় ৩৪৫ বিঘা (১১৪ একর) জমি, বিভিন্ন ব্যাংকের ৩৩টি হিসাব জব্দ ও অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে ৬২৭ বিঘা জমি ক্রোক করা হয়েছে। এর ভেতর এ বাড়িটিও ছিল।২০২৪ সালে আদালত কর্তৃক বাড়িটি ক্রোক হওয়ার পরে পুরোপুরি রাষ্ট্রের অধীনে চলে যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক বাড়িটির সার্বিক দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে বিশাল আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়িটি সরকারি হেফাজতেই রয়েছে।
Advertisement
একসময় ক্ষমতাধর পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের পা পড়লে এই বাড়িটির আশপাশের এলাকা থমথমে হয়ে যেতো। নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেতো। তবে দুই বছর আগে আদালত বাড়িটি ক্রোক হওয়ার পর থেকে আলিশান বাড়িটিতে এখন সুনসান নীরবতা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িতে প্রধান যে দুটি ফটক রয়েছে তা সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে আর কেউ বাড়িটিতে প্রবেশ করতে পারেনি। বাড়ির ভেতর যত আসবাবপত্র রয়েছে, সবগুলো আগের অবস্থায়ই রয়েছে। তবে বাইরের অংশে আলোচিত সেই দুটি কুকুর এখনো দেখা গেছে। পাশাপাশি বাড়িটির সৌন্দর্যবর্ধনে চারদিকে যেসব গাছপালা রোপণ করা হয়েছিল, সেগুলোর পরিচর্যার অভাব লক্ষণীয়। সবমিলিয়ে বাড়িটিতে এখন সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।
তবে বেনজির আহমেদের গ্রেফতারের পর রূপগঞ্জের এই ডুপ্লেক্স বাড়িটি ঘিরে ফের আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য মানুষ বাড়িটি দেখতে আসছেন।
ডুপ্লেক্স বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা আউয়াল মোল্লা বলেন, এক সময় বেনজীর আহমেদ এই বাড়িতে আসলে আশপাশের এলাকা থমথমে হয়ে যেতো। নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের লোকজনে ভরে যেত। সাধারণ মানুষ জন এ পথে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারত না।
Advertisement
ডুপ্লেক্স বাড়িটি দেখতে এসেছেন সিফাতুল মারুফ নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, শুনেছি পুলিশের সাবেক আইজিপির বেনজির আহমেদের ২৪ কাঠা জমির ওপর তৈরি সাভানা ইকো রিসোর্ট নামে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। তিনি দুবাই এয়ারপোর্টে গ্রেফতার হওয়ার পর এটা নিয়ে মানুষের মুখে খুব আলোচনা শুনেছি। তাই বাড়িটি দেখতে এলাম।
আরও পড়ুন বেনজীরের সেই আলিশান বাড়ির বাসিন্দা এখন কেয়ারটেকার আর দুই কুকুরবেনজিরের ডুপ্লেক্স বাড়ির সংলগ্ন দক্ষিণ বাগ বাজারের চায়ের দোকানদার ইব্রাহিম মিয়া বলেন, পুলিশের সাবেক (আইজিপি) বেনজির নাকি দুবাই এয়ারপোর্টে গ্রেফতার হয়েছে। দুইদিন ধরে কাস্টমাররা এসব নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় দোকান সরগরম করে রাখছে।
আলিশান এই বাড়িটির কেয়ারটেকার রতন মিয়া বলেন, এই বাড়িটি নির্মাণে আগে থেকেই আমি এখানে কাজ করছি। বাড়ির মালিকের নামে মামলা হওয়ায় এই বাড়িটি আদালত কর্তৃক ক্রোক করে। তাই বাহিরে কোন মানুষ এখানে আসতে পারে না।
তিনি বলেন, দিনের বেলায় যেমন তেমন এই নীরবতার জন্য রাতে মাঝে মধ্যে খুব ভয় লাগে। গাছ থেকে পাতা পড়লেও শরীর শিউরে ওঠে। এখানে আমি একটি কুকুর পুষি। এটি কোন কিছুর আওয়াজ পেলেই সেদিকে তেড়ে যায়। তখন একটু সাহস লাগে। বাড়ির মালিক দুবাই এয়ারপোর্টে গ্রেফতার হওয়া খবর প্রকাশ পাওয়ার পর দেখছি বিভিন্ন লোকজন এই বাড়িটিকে দেখতে আসছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এখানে যে বাংলো বাড়িটি রয়েছে সেটিতে আদালত থেকে আমাদের রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এটি আমরা দেখাশোনা করছি। এখানে সিকিউরিটির জন্য লোক নিয়োগ দেওয়া আছে এবং এটি সবসময় আমাদের নজরে রেখেছি। ওই বাড়ির মধ্যে যে জিনিসপত্র ছিল সেগুলো দেখাশোনা করছি। সেখানে কিছু প্রাণী ছিল, সেগুলো তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নাজমুল হুদা/এনএইচআর/এএসএম