খেলাধুলা

ইউরো জয় থেকে বিশ্বকাপ মিশন, স্পেন কি আবারও ইতিহাস গড়বে?

মোস্তাকীম আহম্মেদ রাহুল

Advertisement

২০১০ সালে স্বপ্নের বিশ্বকাপ জয়ের পর যেন অনেকটা ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল স্পেন। সেই আসরে সেমিফাইনালে জার্মানি এবং ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার পর ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যায় তারা। এরপর ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর পর আর এগোতে পারেনি স্প্যানিশরা।

তবে এবারের আসরের পরিসংখ্যান এবং স্পেনের একাদশ বলছে ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার চমকে দিতে প্রস্তুত লা রোজারা। ২০২৪ সালের ইউরোজয়ী দল এবারের আসরে ফেবারিট হিসেবেই শুরু করতে যাচ্ছে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা।

ফুটবলে ছোট ছোট পাস এবং দ্রুত মুভমেন্টের মাধ্যমে খেলা গুছিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখার যে কৌশল সেই টিকিটাকার পথিকৃৎ বলা হয় এই স্পেনকেই। তবে পুরোনো সেই দিন ফুরিয়েছে। এই হাই প্রেসিং ফুটবলের যুগে স্পেনের সেই পুরনো টিকিটাকার কৌশল আর টেকে না। সব দলই এখন আধুনিক হাই প্রেসিং ফুটবল খেলে যেখানে গতি, শারীরিক সক্ষমতা এবং কাউন্টার এটাকই খেলার চেহারা বদলে দিতে পারে।

Advertisement

অবশ্য স্পেনও অনেক আগেই তাদের পুরোনো ধাঁচের ফুটবল থেকে বেরিয়ে আধুনিক পাওয়ার ফুটবলের সাথে মানিয়ে নিয়েছে নিজেদের। তারই ফলস্বরূপ আধুনিক ফুটবলে তাদের উত্থান হয়েছে আবার নতুন করে।

ফিফার র‍্যাঙ্কিংয়ে বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্পেন সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০ টায় আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হতে চলেছে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দের।

স্পেনের কোচের দায়িত্বে এবার রয়েছেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ৬৪ বছর বয়সী এই কোচ ২০২২ সালের শেষের দিকে স্পেনের কোচিংয়ের দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে যেন আগের স্পেন আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। পজেশন গেমে অভ্যস্ত দে লা ফুয়েন্তের খেলানোর ধরনকে স্পেনের চিরাচরিত ধরনই বলা চলে।

২০২৩ সালেই স্পেনকে জেতান নেশন্স লিগ। এরপর ২০২৪ সালে তার অধীনেই স্পেন জেতে ইউরো। সেই ইউরোর সেমিফাইনালে ফুটবলের পরাশক্তি ফ্রান্স এবং ফাইনালে আরেক ফেবারিট ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে স্পেন।

Advertisement

ইউরো জিতে যেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার জানান দিলেন যে স্পেনের ফুটবল হারিয়ে যায়নি। তারা আবারও ফিরছে এবং এবার আরও শক্তিশালী-ভয়ঙ্কর রূপে। তবে এবারের আসরে স্প্যানিশ লিগের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের একজন খেলোয়াড়কেও স্পেনের জাতীয় দলে না ডেকে বিভিন্ন বিতর্কের জন্মও দিয়েছেন এই কোচ।

সবকিছু ঠিক থাকলে স্পেন এবারের আসরেও বরাবরের মতো ৪-৩-৩ ফরমেশনেই খেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোলপোস্টের নিচে একাধিক বিশ্বমানের গোলরক্ষকের অপশন থাকলেও স্পেনের জাতীয় দলে বরাবরের মতোই উনাই সাইমনকে শুরুর একাদশে দেখতে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার ব্যাকআপ হিসেবে রয়েছেন আর্সেনালের হয়ে চলতি মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলা ডেভিড রায়া এবং বার্সেলোনার মূল দলের গোলরক্ষক হুয়ান গার্সিয়া। তিনজনের কাউকেই কারও থেকে পিছিয়ে রাখবার সুযোগ সেভাবে না থাকলেও স্পেনের জাতীয় দলের নিয়মিত স্টার্টার উনাই সাইমনই।

সেন্টার ব্যাক হিসেবে বার্সেলোনা ডিফেন্ডার পাও কুবার্সিকে ডানপাশে এবং জাতীয় দলের দীর্ঘদিনের ভরসা আয়মেরিক লাপোর্তেকে বামপাশে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এদের ব্যাক আপ হিসেবে দলে আছেন মার্ক পিউবিল এবং এরিক গার্সিয়া। এদের মধ্যে এরিক গার্সিয়া আবার ডিফেন্সিভ মিডেও খেলতে পারেন যা দলের বৈচিত্র্য এবং গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

ফুলব্যাক লাইনে স্পেনের শুরুর একাদশে থাকতে পারেন অ্যাটলেটকো মাদ্রিদের মার্কোস লরেন্তে এবং সদ্য চেলসি থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া মার্ক কুকুরেয়া। তাদের বদলি হিসেবে আছেন প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব টটেনহামের রাইট ব্যাক পেদ্রো পোরো এবং বুন্দেসলিগার ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনের লেফট ব্যাক আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো।

মিডফিল্ডের দিকে তাকালে স্পষ্টই বোঝা যায় যে কেন এই স্পেন যে কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা রাখে। ডিফেন্সিভ মিডে থাকছেন ম্যানচেস্টার সিটির তারকা এবং ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী ফুটবলার রদ্রিগো হার্নান্দেজ। এছাড়া তার দুই পাশে শুরুর একাদশে দেখতে পাওয়া যেতে পারে বার্সেলোনার মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা পেদ্রি গঞ্জালেজ এবং চলতি মৌসুমে পিএসজির হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা দলের অন্যতম সদস্য ফ্যাবিয়ান রুইজকে।

এছাড়া তাদের বদলি হিসেবে দলে আছেন চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রানার আপ দল আর্সেনালের তারকা মার্টিন জুবিমেন্ডি ও মাইকেল মেরিনো এবং বার্সেলোনার ফুটবলার পাবলো গাভি। এর বাইরে রয়েছেন অ্যালেক্স বায়েনা এবং দানি ওলমো যারা মূলত একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও ধারণা করা হচ্ছে যে উইঙ্গার হিসেবেও তাদেরকে খেলাতে পারেন দে লা ফুয়েন্তে।

অ্যাটাকিং লাইন আপের দিকে আসলে স্পেনের দুইপাশের অপশনের কমতি নেই। ইউরোতে তুখোড় খেলা নিকো উইলিয়ামস চলতি মৌসুমে ইনজুরিতে পড়ায় বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি এবং বলা যায় ২০২৪ এর মতো সেই আগুন ফর্মেও নেই তিনি। ফলে তার শুরুর একাদশে থাকার সম্ভাবনা কমই।

অন্যদিকে বার্সেলোনার মূল তারকা লামিনে ইয়ামাল ইনজুরির কারণে প্রথম ম্যাচে শুরুর একাদশে না থাকলেও বাকি ম্যাচগুলোতে প্রথম একাদশে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ক্লাবের জার্সিতে এই তারকা ২৮ ম্যাচে করেছেন ১৬ টি গোল এবং ১১টি অ্যাসিস্ট।

এছাড়া বার্সেলোনার আরেক ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেস নম্বর নাইন অর্থাৎ স্ট্রাইকার কিংবা উইঙ্গার যে কোনো পজিশনেই খেলতে পারেন। চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার জার্সিতে লা লিগায় এই ফরোয়ার্ডের রয়েছে ৩৩ ম্যাচে ১৬টি গোল এবং ২ টি অ্যাসিস্ট। এছাড়া ব্যাক আপ উইঙ্গার হিসেবে রয়েছেন ভিক্টর মুনোজ এবং ইয়েরেমি পিনো।

নম্বর নাইন রোলে কোচের মূল পছন্দ হতে পারেন মাইকেল ওঃয়ারজাবাল। যিনি মূলত একজন ফলস নাইন হিসেবে উইঙ্গারদের জন্য স্পেস তৈরির ভূমিকায় থাকবেন। তবে ফলস নাইন হলেও চলতি মৌসুমে রিয়াল সোসিয়াদাদের হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ডের ৩৪ টি ম্যাচে রয়েছে ১৫টি গোল এবং ৪টি এসিস্ট। এছাড়া তার বিকল্প হিসেবে দলে রয়েছেন সেল্টা ভিগোর ৩৩ বছর বয়সী প্রবীণ ফরোয়ার্ড বোর্জা ইগলেসিয়াস।

সমীকরণ বলছে প্রথম ম্যাচে শুরুর একাদশে রাইট উইংয়ে থাকতে চলেছেন ফেরান তোরেস এবং লেফট উইংয়ে অ্যালেক্স বায়েনা, যেখানে নম্বর নাইন হিসেবে থাকবেন মাইকেল অয়ারজাবাল। তবে ইয়ামাল ফিরে এলে বায়েনাকে বসিয়ে ফেরান তোরেসকে লেফট উইংয়ে এনে রাইট উইংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে তার কাঁধে।

সব মিলিয়ে মিডফিল্ড এবং অ্যাটাক এই দুটো জায়গাতে স্পেনের হাতে রয়েছে অনেক বেশি অপশন যা তাদের প্রতিপক্ষের ভয়ের কারণ হতে পারে। তবে ডিফেন্সের দিকে তাকালে হয়তো স্পেন ভক্তদের একটু হলেও চিন্তার বিষয় রয়েছে।

তবে মাঠের খেলায় যেকোনো কিছুই সম্ভব। তাছাড়া নিয়মিত ফর্মে থাকা খেলোয়াড়ের সংখ্যার দিক থেকেও তারা এগিয়ে থাকবে। ফলে দলের স্কোয়াড গভীরতা তাদের অন্যান্য দলের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দেবে। সব মিলিয়ে এবারের আসরে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেই স্পেন তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এমএআর/আইএন