অর্থনীতি

দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষী

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুর্বল রাজস্ব আহরণ। দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য পূরণে কর কাঠামো আরও যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন। এছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা সুদের হার বৃদ্ধি ও ব্যবসার জন্য অর্থায়ন সীমিত করতে পারে।

Advertisement

সোমবার (১৫ জুন) ঢাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধির জন্য আস্থা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা গঠন বাজেট-পরবর্তী মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে অ্যামচ্যামের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে অ্যামচ্যামের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি পুনর্ব্যবহৃত তুলার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য শূন্য শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স সুবিধা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর অব্যাহতি ও রিবেটের মতো উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

এসব ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও তিনি বলেন, ব্যবসায়ী মহলের কিছু উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে। বিনিয়োগ, ব্যবসায় সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তার জন্য কর কাঠামোর আরও যৌক্তিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন অ্যামচ্যাম সভাপতি।

Advertisement

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ। তিনি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর একটি পর্যালোচনা তুলে ধরেন।

ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সহায়তা করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি তৈরির একটি বাস্তবসম্মত প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ের ওপর চাপ কমানো, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজেটটি বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়।

তিনি আরও বলেন, বাজেটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চাভিলাষী ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নীতিগত লক্ষ্যকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা সঞ্চালনা করেন অ্যামচ্যামের সহ-সভাপতি এবং মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমেদ।

এ সভায় অংশ নেন অ্যামচ্যামের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল; স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়; সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী। তারা বাজেটের সুযোগ, প্রতিবন্ধকতা ও দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দুর্বল রাজস্ব আহরণকে চিহ্নিত করেন।

তারা বলেন, দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষী। বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা সুদের হার বৃদ্ধি এবং ব্যবসার জন্য অর্থায়ন সীমিত করতে পারে। এতে বিনিয়োগ, ব্যবসায় সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বক্তারা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণে সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও সুশাসন ও লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দেন।

তারা উল্লেখ করেন, উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে অনেক সময় প্রকৃত প্রয়োজনীয়রা বঞ্চিত হন এবং কম প্রয়োজনীয় ব্যক্তিরা সুবিধা পেয়ে থাকেন, ফলে কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়।

অ্যামচ্যাম বাংলাদেশ ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে টেকসই উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আধুনিকায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সমর্থনকারী বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।

বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সরকারের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি জানিয়ে সংগঠনটি উল্লেখ করে যে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

ইএইচটি/এমকেআর