বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল টিকিটের দাম, ভিসা প্রক্রিয়া ও ইরানের অংশগ্রহণ। যুদ্ধের কারণে বিশ্ব আসরে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাত্রাটা কোনো অংশেই কম ছিল না। তব সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশটি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। তবে বলতেই হবে যে, এই অংশগ্রহণ বেশ অস্বস্তি নিয়েই। আগামীকাল ভোরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে লড়বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও।
Advertisement
এখনো দেশটির স্কোয়াডের বেশ কয়েকজন সদস্য পাননি ভিসা। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ম্যাচ ভেন্যু যুক্তরাষ্ট্রে হলেও দলটির বেসক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হয়েছে মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। ভিসা নিয়ে এই জটিলতায় বেশ কয়েকবার ফিফার ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন ইরানের স্কোয়াডের সদস্যরাও। এতসব ঝক্কি-ঝামেলা সঙ্গী করেই লস অ্যাঞ্জেলেসে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানকেই ধরা হচ্ছে ফেবারিট।
যুদ্ধের প্রভাবে জাতিগতভাবে অস্থিরতায় থাকা ইরানের কাছে আগামীকালের ম্যাচটি দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রধান উপলক্ষ। খেলাধুলা সাধারণত একটা জাতিকে একসুতোয় গেঁথে রাখে। তাই নিশ্চিতভাবেই সর্বোচ্চটা দিয়েই ম্যাচটা নিজেদের করে নিতে চাইবে ইরান।
সার্বিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা থাকলেও দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাত ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তির পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Advertisement
খেলাধুলার একটি চিরাচরিত বাস্তবতা হচ্ছে- জাতীয় সংকটে সেই দেশের খেলোয়াড়রা দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দেন। কঠিন পরিস্থিতিতে মাঠের খেলায় সফল হতে বাড়তি তাড়না কাজ করে খেলোয়াড়দের। সেটি কাজে লাগিয়েই বড় অর্জন নিয়ে দেশে ফিরে হাসি ফোটান স্বদেশি সমর্থকদের মুখে। তাই তেমনটা আশা করা যেতেই পারে ইরানের কাছ থেকে।
আর এমন উদাহরণও আছে ভুরিভুরি। অতীত ইতিহাস বলে পশ্চিম জার্মানি, ইরাক, ক্রোয়েশিয়া, ও চলমান আসরে সুযোগ পাওয়া হাইতিই ইরানের সামনে আছে অনুপ্রেরণা হিসেবে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানি চ্যাম্পিয়ন (১৯৫৪)শুরুটা ১৯৫৪ আসরের পশ্চিম জার্মানির গল্প দিয়েই করা যাক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত দেশটি ঘুরে দাঁড়ায় বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে। বিশ্বমঞ্চে চমক দেখিয়ে ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত এই জয় ছিল সেই জাতির পুনর্জাগরণ ও নবজোয়ারের প্রতীক। গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ফাইনালে সেই হাঙ্গেরিকেই স্তব্ধ করে দিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে জার্মানি। সেই সময়ের হাঙ্গেরিকে ধরা হতো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ দল, তাদের ডাকা হতো ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’। মাঠে নামার আগেই সবার মুখে মুখে থাকতো ফলাফল। সেই হাঙ্গেরিই পাত্তা পায়নি জার্মানির সামনে। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ছিল না সেভাবে পেশাদার ফুটবলে খেলার অভিজ্ঞতা। সেই দেশই টানা ৩২ ম্যাচ জেতা অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরিকে হারিয়ে গড়ে ইতিহাস। ফাইনালে ৮ মিনিটেই ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও বৃষ্টির মধ্যে হওয়া ফাইনালে কর্দমাক্ত মাঠেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে ফাইনাল জিতে গড়ে ইতিহাস।
যুদ্ধের মাঝেই প্রথমবার বিশ্বকাপে ইরাক (১৯৮৬)১৯৮৬ বিশ্বকাপে দেশটির জায়গা পাওয়া ছিল এক চমকপ্রদ ঘটনা। যে ইরান এবার অস্বস্তি নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে চলা যুদ্ধের কারণেই সেবার সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিল ইরাক। জাতিগত সংকট কাটিয়েও ঠিকই মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত বিশ্ব আসরে প্রথমবারের মতো নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে দেশটি। তীব্র সামরিক অস্থিরতার মাঝেও বিশ্বকাপে ইরাকের স্থান পাওয়ার ঘটনা ছিল দেশটির জনগণের কাছে ঐক্য আশা ও আকাঙ্ক্ষার এক বিরল মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার গর্ব ছুঁয়ে যায় গোটা জাতিকে।
Advertisement
ভয়াবহ যুদ্ধে যুগোস্লোভিয়ার ভাঙনের ফলে জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে নিজেদের অভিষেক আসরেই চমকে দেয় দেশটি। স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক বছরের মধ্যেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তাক লাগিয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ফাইনালে পৌঁছাতে না পারলেও তৃতীয় হয়ে গোটা জাতিকে আনন্দে ভাসায় দেশটির ফুটবল দল। যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে এমন পারফরম্যান্স, দেশটির ঐক্যকে করেছিল আরও শক্ত ও পাকাপোক্ত।
গ্যাং যুদ্ধ শেষে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে হাইতি (২০২৬)১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ ৫২ বছরের বিরতি ভেঙে চলমান বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছে ক্যারিবান দ্বীপপুঞ্জের দেশ হাইতি। নিজ দেশে ভয়াবহ গ্যাং যুদ্ধের কারণে দেশের একমাত্র ফুটবল স্টেডিয়ামের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাযাবর ফুটবল দলে রূপ নেয় হাইতি। ফিফার নিষেধাজ্ঞায় বছরখানেক অন্যদেশের মাঠে নিজেদের হোম ম্যাচ খেলতে হয় হাইতিকে। নিজেদের হোম ম্যাচগুলো খেলতে হয়েছে কুরাসাওয়ের মাঠে। জাতিগত যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে ৫২ বছর হাইতির বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তন এক বিরাট আনন্দের মুহূর্ত উপহার দেয় দেশটিকে। ইতোমধেই বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপে দুর্দান্ত খেলেও হেরেছে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। বাকি দুই ম্যাচ ব্রাজিল ও মরক্কোর বিপক্ষে।
যুদ্ধ পরিস্থিতেও জাতিকে একসুতোয় গেঁথে বা ঐক্যবদ্ধ রাখতে একাধিক বিশ্ব আসরে ভূমিকা রেখেছে বেশ কয়েকটি দল। যুদ্ধ যে কোনো দেশের কাছেই ন্যাশনাল ট্রমা। ইরান ও দেশটির জনগণের কাছেও এখন বিষয়টা ব্যতিক্রম নয় একটুও। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপ হওয়ায় নানাবিধ জটিলতায় আছেন স্কোয়াডের সদস্যরাও। তবে বাধা ও অস্বস্তি উৎরে আগামীকাল ভোরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ কিছুই করবে ইরান, এমনটাই প্রত্যাশা দেশটির সমর্থকদের। এখন পর্যন্ত কখনোই বিশ্বকাপের নকআউটে যেতে পারেনি ইরান। এবার হয়তো সেটিই হতে যাচ্ছে প্রথমবারের মতো এই সীমাহীন উদ্বিগ্ন পরিস্থিতিতেই।
আইএন/এএসএম