বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সারা দেশে তিন বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের ডিপোগুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি), আর্কিটেকচারার ডিজাইন তৈরি এবং প্রকল্পের নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করতে হ্যাজার্ড অ্যান্ড অপারেবিলিটি স্টাডি (হেজপ) প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন ২০ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে তিন মাস পর অবসরে যাবেন এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন সফর তালিকায়।
Advertisement
বিপিসি ইতোমধ্যে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শতভাগ অটোমেটেড তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এরমধ্যে শতভাগ অটোমেটেড ডিপোও রয়েছে। এসব ডিপো থেকে অভিজ্ঞতা না নিয়ে ২০ কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরে পাঠানো অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ সমালোচকদের। পাশাপাশি সরাসরি বিপিসির স্থায়ী কোনো কর্মকর্তাকে এ সফরে না রাখায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তিন বিপণন কোম্পানির প্রধান স্থাপনা বাদে সারা দেশে ২৫টি আঞ্চলিক ডিপো রয়েছে। এরমধ্যে কুমিল্লা অটোমেটেড ডিপোটি শতভাগ অটোমেশন সুবিধায় পরিচালিত হচ্ছে। বিপিসি বাকি ডিপোগুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছে। ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি, প্রিপারেশন অব ফিড অ্যান্ড সুপারভিশন ফর অটোমেশন অব ডিপোস অব থ্রি অয়েল মার্কেটিং কোম্পানিজ (পিওসিএল, এমপিএল, জেওসিএল) হস ডিফারেন্স লোকেশনস অব বাংলাদেশ’ প্রকল্পে কাজ করছে সিঙ্গাপুর, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশের চারটি যৌথ প্রতিষ্ঠান সুরবানা-ভোল্টেইক-এম+এফ-এনডিই ইনফ্রাটেক (কনসোর্টিয়াম)। এরমধ্যে সুরবানা জুডং সিঙ্গাপুরের, ভোল্টেইক জার্মানি, এম+এফ জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে এনডিই ইনফ্রাটেক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান। মূলত এনডিই (ন্যাশনাল ডেপেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স) ইনফ্রাটেক স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে পুরো ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এনডিই বিগত সরকারের আমলে বেশ দাপটের সঙ্গে সরকারি বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। আর বিগত সরকারের আমল থেকেই ডিপো অটোমেশনের কাজগুলো নিজেদের অধীনে নিতে তৎপর ছিলেন বলে বিপিসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
Advertisement
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা অয়েলের কমপক্ষে চারজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনডিইসহ দেশীয় আরেকটি প্রতিষ্ঠান বিগত সরকারের আমল থেকে পতেঙ্গায় বিপিসির তিন প্রতিষ্ঠানের মেইন ইনস্টলেশন (এমআই) অটোমেশন ও ডিপো অটোমেশনের কাজগুলো নিতে তদবির চালিয়ে আসছে। এমআই ও ডিপো অটোমেশনের এই আলাদা দুই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। এরমধ্যে হাসিনা সরকারের আমলেই এমআই অটোমেশন প্রকল্পের টেন্ডার হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতন হলে টেন্ডার প্রক্রিয়ার ওই কাজ এগিয়ে নিতে পারেনি বিপিসি।’
আরও পড়ুন অর্থ সংকটে নাজেহাল বিপিসিবিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ডিপো অটোমেশন প্রকল্পের ফিজিবিলিটি, নকশা তৈরি এবং হেজপ স্টাডির জন্য ২০ কর্মকর্তাকে সিঙ্গাপুরে এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। গত ৯ জুন ওই চিঠিতে সাক্ষর করেন বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তিন বিপণন কোম্পানির ডিপো অটোমেশনের হেজপ স্টাডির জন্য ২০ কর্মকর্তাকে ১৫ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত বা নিকটবর্তী সুবিধাজনক সময়ে (যাতায়াতব্যতীত ৭ দিন) সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সরকারি আদেশ (জিও) জারির অনুরোধ করা হয়। ওয়ার্কশপ সংক্রান্ত সব ব্যয়, ভেন্যু ব্যবস্থা, ফ্যাসিলিটেশন সেবা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা সম্পূর্ণরূপে কনসালট্যান্ট বহন করবে। ফলে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকবে না বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরালে ব্যয় বাড়বে কয়েকগুণচিঠিতে বিপিসি থেকে বিপিসির পরিচালক (পরিকল্পনা) সরকারের যুগ্মসচিব মুহাম্মদ আসাদুল হক, বিপিসির সচিব (সরকারের উপসচিব) শাহিনা সুলতানা, বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এ কে এম নঈম উল্লাহ এবং সহকারী মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ আলাউদ্দিনসহ চারজনের নাম দেয়া হয়। সেই সঙ্গে তিন বিপণন কোম্পানি থেকে পাঁচজন করে ১৫ জন কর্মকর্তার নাম দেওয়া হয়। এরমধ্যে যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স)-চলতি দায়িত্ব মো. জসিম উদ্দিনের নাম রয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তাকে ভ্রমণ তালিকায় যুক্ত করার বিষয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
Advertisement
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিপিসির চার কর্মকর্তার কেউ বিপিসির স্থায়ী কর্মকর্তা নন। যুগ্মসচিব মুহাম্মদ আসাদুল হক ও উপসচিব শাহিনা সুলতানা দুজনই প্রশাসন ক্যাডারের। অন্য দুই কর্মকর্তা এ কে এম নঈম উল্লাহ ও মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে প্রেষণে বিপিসিতে পদায়িত আছেন। পাশাপাশি যমুনা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর অবসরোত্তর ছুটিতে যাবেন।
আরও পড়ুন পরিশোধিত জ্বালানির ৮০ শতাংশ এক চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণেএ বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে কথা হলে বিপিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, বাণিজ্য ও পরিচালন বিভাগ থেকে স্থায়ী কোনো কর্মকর্তাকে ওই প্রশিক্ষণে না রাখায় বিপিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির দুই কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, একজন কর্মকর্তা সাত দিন যদি সিঙ্গাপুরে থাকেন, তাতে জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা খরচ হলে, সবমিলিয়ে ওই ট্যুরে এক কোটি টাকার মতো খরচ হবে। সবই হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। তাছাড়া যে প্রতিষ্ঠান ফিজিবিলিটি স্টাডি করছে, তারা তাদের প্রস্তাবে এ ট্যুরের খরচ ধরেই ব্যয় প্রস্তাব করেছে। তাতে সরাসরি সরকারি অর্থ ব্যয় না হলেও পরোক্ষভাবে সরকারের টাকাই খরচ হচ্ছে।
আরও পড়ুন জ্বালানি খাতের আরেক বিপিসি!দেশে অটোমেশন সুবিধা রয়েছে এমন ডিপোগুলোর উদাহরণ টেনে দুই কর্মকর্তা বলেন, বিপিসি ইতোমধ্যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন বসিয়েছে। ওই প্রকল্পের অধীনে কুমিল্লায় শতভাগ অটোমেটেড ডিপো হয়েছে। ডিপোটির বর্তমানে কার্যক্রম চলছে। গোদনাইল ডিপোতে পাইপলাইনের রিসিভিং ট্যাংকগুলো অটোমেশন সুবিধাযুক্ত। তাছাড়া আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পটিও পুরোপুরি অটোমেটেড। একইসঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনটিও অটোমেটেড। তাই নতুন ডিপো অটোমেশন প্রকল্পের হেজপ প্রশিক্ষণ দেশের বাইরে না গিয়ে আমাদের দেশের অটোমেশন সুবিধা চলমান থাকা ডিপোগুলো থেকেই অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতো।
তারা বলেন, বিপিসির বাণিজ্য ও পরিচালন বিভাগের কর্মকর্তারা বিপণন কোম্পানির ডিপোগুলো তদারকি করেন। অথচ হেজপ স্টাডি প্রশিক্ষণে বিপিসির ওই বিভাগ থেকে কাউকে রাখা হয়নি।
আরও পড়ুন জ্বালানি তেল সরবরাহে মানা হয় না নিয়ম-নীতিএ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিন মাস পরে অবসরে যাবেন এমন কর্মকর্তাকে সিঙ্গাপুরে কর্মশালায় প্রশিক্ষণে পাঠানো কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। লুটপাটের বাংলাদেশে এটি ওই কর্মকর্তাকে ব্রাইব (ঘুস) দিচ্ছে। এটি কর্মশালার নামে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি প্রমোদভ্রমণ।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে জ্বালানি সেক্টরটা সবচেয়ে লুটপাটের জায়গা। একজন কর্মকর্তা অক্টোবরে অবসরে গেলে, তার এই প্রশিক্ষণ সরকারের কোনো কাজেই আসবে না। তাকে প্রশিক্ষণ করানোটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। একইভাবে মন্ত্রণালয়ের সচিবদের ট্রেনিংয়ে বিদেশে পাঠানো হয়, ট্রেনিং নিয়ে আসার পর অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করে দেওয়া হয়।’
আরও পড়ুন এক মাসে শুধু ডিজেলে বিপিসির ‘গচ্চা’ ১০১ কোটি টাকাএ ধরনের কর্মশালা আমাদের দেশেই আয়োজন করা যেতো বলে মন্তব্য করেন অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী। বলেন, ‘এখন অনলাইনে গুগলে এ ধরনের তথ্য সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। এসব ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হয় না।’
তিন বিপণন কোম্পানির ডিপো অটোমেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদ্মা অয়েল কোম্পানির উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মো. ফারুক হোসেন মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে হেজপ ট্রেনিংয়ে আমরা প্রকল্প থেকে ১৫ জনের নাম প্রস্তাব করে বিপিসিতে চিঠি দিয়েছি। বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ থেকেও আরও পাঁচজন কর্মকর্তার সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ওই পাঁচজনের নাম বিপিসি ও মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হবে।’
তিন মাস পরে অবসরে যাবেন এমন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণে পাঠানোর বিষয়ে ফারুক হোসেন মাহমুদ বলেন, ‘ওই কর্মকর্তার আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য তাকে হেজপ স্টাডি ওয়ার্কশপে রাখা হয়েছে।’
আরও পড়ুন বিপিসির মোংলা জেটিতে ভেড়ে না জাহাজ, ফাঁকা তেলের ট্যাংকতবে সর্বশেষ ১৫ জুন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো জিও জারি করেনি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
এ ব্যাপারে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের দাপ্তরিক মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে এ বিষয়ে কথা বলতে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া খুদে বার্তা সিন করলেও কোনো সাড়া দেননি।
এমডিআইএইচ/এমএমএআর