ফুটবল বিশ্বকাপের একেকটি ম্যাচ যেন একেকটি ইতিহাস রচনা করে। এখানে যেমন হার-জিত আছে তেমনি আছে হৃদয় ছোঁয়া কিছু ঘটনা, বিস্ময় আর উন্মাদনা নিয়ে একেকটি রাত জাগা ম্যাচ দেখা শেষ হয়। কিন্তু তার রেশ রয়ে যায় পরবর্তী বছরগুলোতে। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের আসরে তেমনি সবার নজর কেড়েছেন একজন গোলকিপার। নিশ্চয়ই পাঠক এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে কার কথা বলছি।
Advertisement
স্পেনের বিপক্ষে ০-০ ড্র করে বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে কেপ ভার্দে। বিশেষ করে গোলকিপার ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ম্যাচজুড়ে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের নায়ক হয়ে ওঠেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। ফুটবল বিশ্বের অনেকের কাছেই কেপ ভার্দে ছিল প্রায় অচেনা একটি দেশ। কিন্তু স্পেনের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের রুখে দিয়ে রাতারাতি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্র।
কেপ ভার্দে বা কাবো ভের্দে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ১০টি প্রধান আগ্নেয়গিরি-উৎপত্তির দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশটির রাজধানী প্রাইয়া। আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত এবং আগ্নেয়গিরির জন্য দেশটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে ফোগো দ্বীপের ‘পিকো দো ফোগো’ আগ্নেয়গিরি দেশটির অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
জনসংখ্যার দিক থেকেও কেপ ভার্দে বিশ্বের অন্যতম ছোট দেশ। ২০২৬ সালে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার। বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.০০৬ শতাংশেরও কম মানুষ এই দেশে বাস করেন। বিশ্বের জনসংখ্যার তালিকায় তাদের অবস্থান ১৭৪তম। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের ভেতরের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন।
Advertisement
কেপ ভার্দের সংস্কৃতিতেও রয়েছে আফ্রিকান ও পর্তুগিজ ঐতিহ্যের মিশেল। দেশটি দীর্ঘদিন পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। ফলে এখানকার সরকারি ভাষা পর্তুগিজ। পাশাপাশি কেপ ভার্দিয়ান ক্রেওল ভাষাও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সংগীতপ্রেমীদের কাছে দেশটি বিশেষভাবে পরিচিত ‘মরনা’ সংগীতের জন্য, যা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
খাবারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্য। কেপ ভার্দের জাতীয় খাবার ‘কাচুপা’, যা ভুট্টা, শিম, সবজি ও মাংস বা মাছ দিয়ে তৈরি করা হয়। দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় সামুদ্রিক মাছ দেশটির খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টুনা, লবস্টার ও বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছের পদ স্থানীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয়। দেশটির রান্নায় আফ্রিকান ও ইউরোপীয় প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ফুটবলের কথা বলতে গেলে, কেপ ভার্দের জাতীয় দলের ডাকনাম ‘ব্লু শার্কস’। দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকার উদীয়মান ফুটবল শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল তারা। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তারা ১০ ম্যাচের মধ্যে সাতটিতে জয় পায় এবং শক্তিশালী ক্যামেরুনকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে জায়গা নিশ্চিত করে।
আরও পড়ুন বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোল দিয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল যে খেলোয়াড়েরবিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দে পড়েছে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে। কাগজে-কলমে তাদের তুলনায় অনেক শক্তিশালী দল থাকলেও প্রথম ম্যাচেই স্পেনকে রুখে দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপে কোনো দলকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ম্যাচে স্পেনের বিপুল বল দখল ও একাধিক গোলের সুযোগ থাকলেও ভোজিনহার নেতৃত্বে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ অসাধারণ দৃঢ়তা দেখায়।
Advertisement
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের গল্প আসলে শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি একটি ছোট দেশের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি দেখিয়ে দিয়েছে, জনসংখ্যা বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, সঠিক পরিকল্পনা, প্রতিভা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের চাবিকাঠি হতে পারে। স্পেনের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ড্রয়ের পর এখন ফুটবল বিশ্ব আগ্রহ নিয়ে দেখছে ‘ব্লু শার্কস’ কি আরও বড় কোনো চমক উপহার দিতে পারে?
সূত্র: ব্রিটানিকা, বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা স্পোর্টস
কেএসকে