দেশজুড়ে

নারায়ণগঞ্জে বোমা হামলা: ক্ষমতা বদলালেও মেলেনি বিচার

নারায়ণগঞ্জে বোমা হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হলো আজ ১৬ জুন। ২০০১ সালের এই দিনে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান।

Advertisement

এসময় গুরুতর আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক লোক। আর চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেন জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান চন্দন শীল ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রতন দাসসহ আরও অনেকেই।

তবে বিগত ২৫ বছরেও এই বোমা হামলার বিচার হয়নি। নানা কারণেই এই মামলার বিচার কার্যক্রমকে বিলম্বিত করা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েও এই হামলার বিচারকার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হয়নি।

সবশেষ এমপি শামীম ওসমান সাক্ষ্য দিতে গিয়ে চার্জশিটের বিষয় প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট আদালত মামলার রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন। কিন্তু সেদিন রায় ঘোষণা না করে নতুন করে তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে।

Advertisement

আদালত সূত্র জানায়, এতদিন মামলার মূল নথি ছাড়া শুধু ফটোকপি ব্যবহার করেই সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। মূল নথি ছাড়া মামলার রায় ঘোষণা কী করে সম্ভব-এমন প্রশ্ন তোলেন আসামিপক্ষ। এরপরেই মূল নথির খোঁজে পুনরায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেন বিচারক। পরবর্তী তারিখে তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে আদালতকে নথি সম্পর্কে অবহিত করবেন। এরপরেই রায়ের ব্যাপারে আদালত নতুন তারিখ ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ অফিসে এই বোমা হামলার ঘটনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছিলেন। হত্যা এবং বিস্ফোরক আইনে মামলা দুটি করা হয় সদর মডেল থানায়। মামলা দুটি পর্যায়ক্রমে আটজন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেন।

২০০১ সালের ১৬ জুন বোমা হামলার ঘটনার পর ঐ বছরেই অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে। ২০০৩ সালে মামলার বাদির অগোচরেই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে বাদি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলে ২০০৮ সালের ১৭ আগস্ট উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ২ মে ছয় জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। তবে বরাবরই মামলার কার্যক্রমে ধীরগতি ছিল লক্ষণীয়।

Advertisement

আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলেও চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচার কাজ সম্পন্ন করে যেতে পারেনি। উপরন্তু ওই মামলার অন্যতম ভিকটিম ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান মামলায় সাক্ষ্য না দিয়ে মামলার অধিকতর তদন্ত দাবি করে সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিরত থাকেন।

সাক্ষ্য প্রদান না করে তিনি বলেছিলেন, ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি ১৬১ ধারায় যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। এজন্য তিনি আদালতে সাক্ষ্য না দিয়ে মামলার অধিকতর তদন্ত দাবি করেছেন।

মামলার অন্যতম আসামি নাসিক ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ বারের কাউন্সিলর বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকু বলেন, ‘এতদিন মামলাটি চলেছে মূল নথি ছাড়াই। সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে রায়ের তারিখও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় মামলার মূল নথি নেই। মূল নথি ছাড়া রায় লেখা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। আমাদের আইনজীবীরা আদালতের সামনে এমন প্রশ্ন রাখেন। এরপর বিচারক মূল নথির সন্ধানে পুনরায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেন।’

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক নয়ন বলেন, ‘গত বছরই মামলার রায় ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু রায় ঘোষণা হয়নি। বিচারক মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে পুনরায় তলব করেছেন।’

যাদের প্রাণহানি ঘটে

সেদিন নিহত হয়েছিলেন শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন, সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক মহিলা।

হামলায় শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।

আজও কান্না থামেনি ২০ পরিবারের

চাষাড়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা নিহত ২০ পরিবারের স্বজনদের কান্না আজও থামেনি। আজও কেঁদে ফিরছে ওই ২০ পরিবার। স্বজন হত্যাকারীদের বিচার পাননি তারা। ভবিষ্যতেও পাবে কিনা তাও জানে না হতভাগ্য এ পরিবারগুলো। উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্যকে হারিয়ে আর্থিক দৈন্যদশায় জর্জরিত অনেক পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। এত কষ্টের মধ্যেও তাদের একটি দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা হোক।

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর একেএম ওমর ফারুক নয়ন বলেন, ‘দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়নি। তারা মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেননি। যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার বিচার কার্যক্রম ঝুলেছিলো। বর্তমান সরকারের সময়ে আদালত মামলাটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে।’

মোবাশ্বির শ্রাবণ/এফএ/এমএস