অসুস্থ বাবাকে বাঁচাতে রাজধানীর একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের আবু হুরায়রা। কিন্তু চিকিৎসার আশায় শুরু হওয়া সেই যাত্রা শেষ হয় বাবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো, চিকিৎসা অবহেলা ও প্রতারণার অভিযোগ তুলে এখন দুই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
Advertisement
মঙ্গলবার (১৬ জুন) ঢাকার আদালত মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় আগামী ৯ জুলাই প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত।
চিকিৎসার নামে প্রতারণা, অবহেলা কিংবা আর্থিকভাবে জিম্মি করার ঘটনা ঘটেছে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এমন অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের ক্ষতির বিষয় নয়, এটি জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থার সঙ্গেও জড়িত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং হৃদয় জেনারেল হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।
Advertisement
মঙ্গলবার সকালে তাকে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে শুনানির অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। পরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। এ সময় তিনি মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র দেখান।
দুই হাসপাতালের বিরুদ্ধে আবু হুরায়রা
তার করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন মানিকগঞ্জের বাসিন্দা জিন্নাত আলী। পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে যান।
সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে হাসপাতালের এক কর্মচারীর পরিচয় হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তি রোগীর স্বজনদের জানান যে হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি নেই এবং রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দ্রুত অন্যত্র না নিলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
Advertisement
পরিবারের দাবি, সরকারি হাসপাতালে দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার আশঙ্কায় তারা ওই কর্মচারীর পরামর্শে শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তর করেন।
চিকিৎসার বদলে বাড়তে থাকে ভোগান্তিআবু হুরায়রার অভিযোগ, বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পর একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং বিভিন্ন খাতে অর্থ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বড় অঙ্কের বিল তৈরি হয়।
আমরা চাই আদালতের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হোক। একজন মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে যদি প্রতারণা, অবহেলা বা অনিয়মের শিকার হন, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।
এজাহারে বলা হয়েছে, রোগীকে আবার সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি বিল পরিশোধ না করা পর্যন্ত চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা এবং রোগীকে আটকে রাখারও অভিযোগ করা হয়েছে।
আদালতের বারান্দায় আবু হুরায়রা-ছবি জাগো নিউজ
আবু হুরায়রা জানান, একপর্যায়ে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে বিলের একটি অংশ পরিশোধ করতে বাধ্য হন তারা। পরে রোগীকে পুনরায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে ফেরানোর পর মৃত্যুআবু হুরায়রার দাবি, সরকারি হাসপাতালে ফেরত নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের জানান, রোগী আগে যথাযথ চিকিৎসা পাননি। ভর্তি হওয়ার কিছু সময় পরই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জিন্নাত আলী।
বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে সরকার ও বিচার বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করে। যে কোনো মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বাবার মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়ে আরও বিপাকে পড়েন আবু হুরায়রা। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকজনের বিরুদ্ধে তাকে মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিকার না পেয়ে আদালতেঘটনার পর আবু হুরায়রা বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিলেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে ঘোরাঘুরির পর অবশেষে তিনি আদালতে মামলা করেন।
আরও পড়ুন জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল / দালাল-চোরের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ রোগী-চিকিৎসকমামলায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং হৃদয় জেনারেল হাসপাতালের মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে হাসপাতালের শীর্ষ কর্মকর্তা, কয়েকজন ওয়ার্ডবয়, নিরাপত্তাকর্মী এবং বেসরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়েছেন।
কোন ধারায় মামলামামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২, ৩০৪, ৩২৩ ও ৫০৬ ধারায় দায়ের করা হয়েছে।
এসব ধারায় যথাক্রমে হত্যাকাণ্ড, অবহেলা বা বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে মৃত্যু, মারধর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন বা প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তদন্তে অগ্রগতির দাবিমামলার বাদীপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন।
বাদীপক্ষের দাবি, তদন্তে অভিযোগের বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী পরিবারও আশা করছে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে।
আরও পড়ুন ওয়ার্ড বয়ও ‘চিকিৎসক’, রোগীর অসহায়ত্ব ঘিরে কর্মচারীদের রমরমা ব্যবসামামলার বাদীর আইনজীবী মোকছেদুল হাসান মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা চাই আদালতের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হোক। একজন মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে যদি প্রতারণা, অবহেলা বা অনিয়মের শিকার হন, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।’
দায়ীদের জবাবদিহিএ বিষয়ে সুরক্ষা ও মর্যাদা ফোরামের মানবাধিকারকর্মী সুমি আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকারের অংশ। কোনো রোগী বা তার স্বজন যদি অভিযোগ করেন যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা, অবহেলা কিংবা আর্থিকভাবে জিম্মি করার ঘটনা ঘটেছে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এমন অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের ক্ষতির বিষয় নয়, এটি জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থার সঙ্গেও জড়িত। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসা এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
সরকারি হাসপাতালে ফেরত নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের জানান, রোগী আগে যথাযথ চিকিৎসা পাননি। ভর্তি হওয়ার কিছু সময় পরই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জিন্নাত আলী।
ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন জাগো নিউজকে বলেন, বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে সরকার ও বিচার বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করে। যে কোনো মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আশাকরি এই মামলাটিও আইন অনুযায়ী অগ্রগতি পাবে।
৯ জুলাইয়ের দিকে তাকিয়ে পরিবারজিন্নাত আলীর মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েক মাস। কিন্তু পরিবারের দাবি, তাদের প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি— কেন একজন রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এবং সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা পেলে তার জীবন বাঁচানো সম্ভব ছিল কি না।
আরও পড়ুন হাসপাতালে রোগী মৃত্যুর মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন পিছিয়ে ৯ জুলাইএসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আবু হুরায়রা। এখন তার প্রত্যাশা, তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার পর মামলার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমডিএএ/এসএইচএস