ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এর জেরে অনেক দেশেই বিদ্যুতের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে স্পেনে। বৈশ্বিক এই সংকটের মধ্যেও দেশটির সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল উল্টো কমেছে।
Advertisement
নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে স্পেনের প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে গড়ে ১০ ইউরো (প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা) করে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় করেছে। মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য বা সবুজ শক্তির দিকে ঝুঁকানোর কারণেই দেশটি এই সাফল্য পেয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় স্পেনের বিদ্যুৎ বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে।
গ্যাসের প্রভাব কমেছেসাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সবচেয়ে ব্যয়বহুল উৎস। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করা হলেই বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়। স্বাধীন জ্বালানি বিষয়ক থিংক-ট্যাংক ‘এমবার’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২১ সালে স্পেনের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে গ্যাসের প্রভাব যেখানে ছিল ৫২ শতাংশ, ২০২৬ সালের শুরুতে তা মাত্র নয় শতাংশে নেমে এসেছে। মূলত ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটিতে বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন ভারতের অনুমোদন না মেলায় নেপাল থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে না বাংলাদেশপ্রতিবেদনের লেখক ক্রিস রস্লো বলেন, ‘বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও মূল্যের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। যখন বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তখন নবায়নযোগ্য শক্তি স্পেনের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণে রাখছে।’
Advertisement
২০১৯ সালের পর থেকে স্পেন তাদের বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা দ্বিগুণ করেছে, যা প্রায় ৪০ গিগাওয়াটেরও বেশি। জার্মানির পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর কোনো দেশ এত দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটাতে পারেনি। এমনকি ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে স্পেন বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিন্দুমাত্র কয়লা ব্যবহার করেনি। অথচ মাত্র ১০ বছর আগেও দেশটির মোট বিদ্যুতের এক-চতুর্থাংশ আসত কয়লা থেকে।
আরও পড়ুন জ্বালানি সংকটেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিশ্চিন্ত যেসব দেশ ইউরোপের অন্য দেশের তুলনায় সাশ্রয়স্পেনের এই চমৎকার উদ্যোগের সুবিধা যেখানে দেশটির জনগণ পাচ্ছে, সেখানে ইউরোপের বাকি দেশগুলো বিপুল খরচের মুখে পড়েছে। ইতালির মতো গ্যাস-নির্ভর দেশে চলতি বছরের মার্চ মাসে বিদ্যুতের গড় দাম ছিল প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ১৪৩ ইউরো, যা স্পেনের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে স্পেনের পাইকারি বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে ইউরোপের মধ্যে সর্বনিম্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামগ্রিকভাবে ইইউ তাদের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বাড়িয়েছে, যার ফলে যুদ্ধের কারণে জোটটিকে ৬০ বিলিয়ন ইউরোর বিশাল জ্বালানি বিল মেটাতে হচ্ছে।
সরকারের জরুরি পদক্ষেপএমবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইইউতে গ্যাসের পাইকারি দাম ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আর এর পুরো ফায়দা তুলছে বড় বড় জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো। গ্রিনপিসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইইউর তেল কোম্পানিগুলো প্রতিদিন অতিরিক্ত ৮১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ইউরো মুনাফা লুটছে।
Advertisement
এই পরিস্থিতিতে স্পেনের সরকার সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সাময়িক কর কমানোর কারণে স্পেনের নাগরিকদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল থেকে আরও আট ইউরো কমেছে।
যদিও ২০২৫ সালের এপ্রিলে এক ভয়াবহ গ্রিড বিপর্যয়ের (ব্ল্যাকআউট) মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন, কিন্তু সেই বিপর্যয়ও দেশটির নবায়নযোগ্য শক্তির অভিযাত্রাকে থামাতে পারেনি। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে স্পেন গড়ে ১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট করে বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে, ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা আরও কমিয়ে এনেছে দেশটি।
সূত্র: ইউরো নিউজকেএএ/