সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম নিয়মিত সরেজমিনে তদারকি করা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন পর্যায়ে মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রতিদিন সব স্থানে গিয়ে নজরদারি করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
Advertisement
ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি, নির্ধারিত সময়ে অফিসে না থাকা, কাজ ফেলে রাখা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান, রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হওয়ার কথা প্রায়ই বলে আসছেন সেবাগ্রহীতারা। এসব অভিযোগ কমিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি বাড়াতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার পথে হাঁটছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন আট তলা ভবনটির মালিক কে?মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ভূমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম মোবাইল অ্যাপভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। জিও-লোকেশন ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মকর্তারা কর্মস্থলে উপস্থিত আছেন কি না, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং অফিস চলাকালে কোথায় অবস্থান করছেন, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রথম ধাপে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় পাইলট প্রকল্প (পরীক্ষামূলক) হিসেবে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
Advertisement
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এজন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সেবা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে দেবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট কত ব্যয় হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবাটি নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আরও পড়ুন প্রতিমন্ত্রী / ভূমি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিতে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারিকর্মকর্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের বড় একটি অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি কেন্দ্র করে। অনেক সময় সেবাপ্রার্থীরা অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে খুঁজে পান না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের কথা বললেও বাস্তবে তারা কোথায় অবস্থান করছেন, তা যাচাইয়ের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে জনগণের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটালাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পারফরম্যান্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম নিয়মিত সরেজমিনে তদারকি করা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন পর্যায়ে মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রতিদিন সব স্থানে গিয়ে নজরদারি করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর একটি কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অ্যাপ চালুর আগে একটি ইউজার ম্যানুয়াল তৈরি করা হবে, যেখানে সফটওয়্যারের ব্যবহার, মনিটরিংয়ের সীমা, তথ্য সংরক্ষণ ও জবাবদিহির বিষয়গুলো বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। বর্তমানে সফটওয়্যার উন্নয়ন ও পাইলট প্রকল্পের প্রস্তুতি চলছে। জুলাই-আগস্টের মধ্যেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।— ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিকেএমপি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী
Advertisement
তিনি বলেন, অ্যাপের মাধ্যমে আমরা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি মনিটরিং করবো। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অ্যাপটি নেবো। তবে এ বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
আরও পড়ুন ভূমি উন্নয়ন কর নিয়ে আপত্তি ৭ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশঅ্যাপটি চালুর আগে একটি ইউজার ম্যানুয়াল তৈরি করা হবে জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, ম্যানুয়ালে সফটওয়্যারটির ব্যবহার, মনিটরিংয়ের সীমা, তথ্য সংরক্ষণ এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো সেখানে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে। বর্তমানে সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং পাইলট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। জুলাই-আগস্টের মধ্যেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
পাইলট প্রকল্পের ফলাফল ইতিবাচক হলে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসগুলো এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। তবে কোন কোন পদমর্যাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এতে অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং চূড়ান্ত বাস্তবায়ন কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান এমদাদুল হক।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন ব্যবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্মার্টফোনে একটি বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে। অ্যাপটির মাধ্যমে তাদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত হবে এবং একটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তা দেখা যাবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্মকর্তা, অফিস বা এলাকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
আরও পড়ুন বেদখল খাসজমি উদ্ধারে ডিসিদের নির্দেশসূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভূমি প্রশাসনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক তদারকি রয়েছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায়ই আকস্মিক পরিদর্শন করেন। জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও মাঠপর্যায়ে নজরদারি করেন। কিন্তু দেশের হাজারো ভূমি অফিসে প্রতিদিন সরাসরি তদারকি করা সম্ভব নয়। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ভূমি অফিস বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্ম এলাকার জন্য নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হবে। কোনো কর্মকর্তা অফিসে উপস্থিত হয়েছেন কি না, দায়িত্ব পালনের জন্য মাঠে গেছেন কি না এবং পরে আবার অফিসে ফিরেছেন কি না, তার তথ্য সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অজুহাতে দীর্ঘসময় অনুপস্থিত থাকার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন রাজস্ব না দেওয়া চা বাগান দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশভূমি সেবা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাগুলোর একটি। জমির মালিকানা, নামজারি, খাজনা, রেকর্ড সংশোধনসহ নানা সেবা সরাসরি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এসব সেবা পেতে গিয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষকে একাধিকবার অফিসে যেতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকা বা প্রয়োজনীয় নথি নিষ্পত্তিতে বিলম্বের অভিযোগও প্রায়ই পাওয়া যায়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অধিকতর জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে উদ্যোগটি নিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন পর্যবেক্ষণের প্রকল্প নয়। বরং সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে আছেন কি না এবং জনগণকে সেবা দিচ্ছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। প্রাথমিকভাবে অফিস সময়ের মধ্যেই মনিটরিং সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগত চলাফেরা বা কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
আরএমএম/এমএএইচ/এমএফএ