অর্থনীতি

অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলো চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল

এক দশকের বেশি সময় নানান জটিলতায় আটকে থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

Advertisement

মঙ্গলবার (৯ জুন) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। পরে তা অনুমোদন দেওয়া হয়। একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  

এদিন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ৭ হাজার ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৫৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ হিসেবে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন থাকবে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের ঋণ হিসেবে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।  

Advertisement

আরও পড়ুন ইউরোপে পোশাক রপ্তানির আয় তিন মাসে কমেছে ২০ শতাংশ

তবে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করেন। তিনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা, ইটিপির মাধ্যমে পানি পরিশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি— বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশনা দেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সড়ক অন্যান্য ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

প্রকল্পটির অনুমোদনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরের ঠিক আগে চীনা ঋণনির্ভর এই বৃহৎ প্রকল্পের অনুমোদন মিলেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকল্পটি নিয়মিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই একনেকে এসেছে। সফরের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা খুঁজে বের করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জি টু জি) ভিত্তিতে গড়ে তোলা হচ্ছে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটির অবস্থানকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সরকার আশা করছে, এটি ভবিষ্যতে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে ২০১৪ সালে এই অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০১৬ সালে প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন কাঠামো এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

Advertisement

শুরুতে প্রকল্পটির ডেভেলপার হিসেবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় অগ্রগতি থমকে যায়। পরে ২০২২ সালে চীন সরকারের মনোনয়নে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে দায়িত্ব পায়। বর্তমানে সিআরবিসির সঙ্গে ডেভেলপার চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছে বেজা।

একনেকে উপস্থাপিত সর্বশেষ পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণের আওতায় পাওয়া যাবে দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে চেষ্টা করছে দুদক

প্রকল্পের আওতায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে এক হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক রোড ও ৩৩০ মিটার সেতু, এক হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেন সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার সক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, গ্যাস সরবরাহ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, ট্রান্সমিশন লাইন, পানি সংরক্ষণাগার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাউন্ডারি ওয়াল।

প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি চূড়ান্ত হলে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে। সম্প্রতি বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, চীনা পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রকল্পটি উভয় দেশই অগ্রাধিকারভুক্ত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।

সরকারের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতে চীনা বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এমওএস/কেএসআর