মতামত

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি: বাকিদের চলবে কেমন করে?

কর্মক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির মতো এত আনন্দের খবর আর হয় না। দেশে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বেতন বৃদ্ধি হওয়াটা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু এই খবরটি তখনই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যখন বেতন বাড়ার বিষয়টি শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। অসংখ্য খাতের মধ্যে শুধু একটি খাতের বেতন বৃদ্ধিতে দেশে কর্মরত অন্যান্য সেক্টরের মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক।

Advertisement

সরকার বেতন বাড়ালে বিষয়টি চারদিকে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, সবার মুখে মুখে এই সংবাদ ঘুরতে থাকে। তখন সেই অনুপাতে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, শিক্ষাব্যয়, যাতায়াত ব্যয়সহ নানা কিছুর দাম বেড়ে যায়। শোনা যাচ্ছে, সরকার প্রায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে। কাজেই বাজারে সেই অনুপাতেই ধাক্কাটা এসে লাগবে।

পাশাপাশি যাদের বেতন বাড়ছে না, পুরো চাপটা এসে পড়বে তাদের ঘাড়ে। এর মানে, বেসরকারি খাতে চাকরিরত মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাজারে আরও বাড়তি দামের মুখোমুখি হবেন। এই বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। পণ্যের দাম আরও বেড়ে গেলে সরকারি চাকরির বাইরে থাকা মানুষ অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সরকারি কর্মচারীদের প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা সাধারণ নাগরিকদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সরকারি চাকরির বাইরে যারা রয়েছেন, তারা কীভাবে এবং কতটা স্বস্তি ও সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Advertisement

দেশের সব মানুষ সাধারণত সরকার কর্তৃক গৃহীত নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিভিন্ন সমান্তরাল আর্থিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বৈষম্য হ্রাস করা। কিন্তু শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এত উচ্চহারে বেতন বৃদ্ধি জনগণের মধ্যে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সরকারি কর্মচারীরা সরাসরি উচ্চ বেতনের সুবিধা পেলেও অধিকাংশ খাতের কর্মীরা সেই সুবিধা পাবেন না। অথচ একই দামে দুজনকেই কেনাকাটা করতে হবে। এই আর্থিক বৈষম্য সমাজে অসমতা আরও তীব্র করবে বলে অনেকের আশঙ্কা। সরকার মনে করে সরকারি কর্মীদের দেখভালের দায়িত্ব তাদের, আর বাকিরা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নেবে। সরকারের পক্ষ থেকে এটি যেন এক ধরনের বিমাতাসুলভ আচরণ হয়ে যায়।

কারও বেতন বৃদ্ধিতে আমাদের খানিকটা হতাশা থাকলেও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু দুটি ইস্যুতে কথা না বলে পারছি না। এক, বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপেই প্রতি বছর অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনতে পারে বটে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল অর্থ আসবে কোথা থেকে? এ প্রসঙ্গে অবশ্য সরকার কোনো পন্থার কথা খোলাসা করেনি। জানা মতে, জনগণের করের টাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, পুরো চাপটা মানুষের করের ওপরই পড়বে।

দেশের ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারকে এ ব্যয় বহন করতে হবে। তাই প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ নিয়ে আরেকবার ভাবা দরকার। দ্রব্যমূল্যের বাড়তি চাপ না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু এই বড় অঙ্কের টাকার জোগাড়ও কি জনগণের করের টাকায় করা হবে?

সরকারের দৈনন্দিন ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ঋণ নিচ্ছে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে এবং রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থাও দুর্বল। লক্ষ্য করছি, নানা কায়দায় রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর সঞ্চয়ের দিকে দৃষ্টি পড়েছে সরকারের। তা ছাড়া কালো টাকা সাদা করার বিষয়টিও রয়েছে।

Advertisement

এককথায় বলা যায়, সরকার দেশের অর্থব্যবস্থা নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক চাপে রয়েছে। তাহলে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুখী করার জন্য এত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করবে সরকার? অর্থনীতিবিদরাও এই দিকটির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন বারবার।

আর দ্বিতীয়ত, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। তাঁর যুক্তি হলো, অভাব মানুষের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা সৃষ্টি করে। সত্যিই কি তাই? বেতন কম বলেই কি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করেন? দুর্নীতির সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক আদতে কতটা? সম্পর্ক থাকলেও সেটি কি একমাত্র কারণ? বরং জবাবদিহিতা, দুর্নীতির জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই দুর্নীতির বড় কারণ।

এর আগেও বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল। ২০১৫ সালে মূল বেতন গড়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল। মূলত সেই সময় থেকেই সরকারি চাকরি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই বেতন বৃদ্ধি কি দুর্নীতি কমাতে পেরেছে? সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে, ব্যাংক খাতে, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যে দুর্নীতি চলছেই। বরং বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে হয়েছে বড় নয়-ছয়।

দুর্নীতি না করা ও সৎ থাকার বিষয়টি মানুষের ভেতর থেকে আসতে হয়। আমরা অনেককে দেখেছি, জীবন বাজি রেখে কষ্ট করে আয় করছেন, যেন দুর্নীতি করতে না হয়। আবার বড় একটি অংশকে দেখেছি, যারা কোনো কারণ ছাড়াই দুর্নীতি করেন। প্রয়োজন নেই, তবুও অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভাঙেন। যারা সরকারের বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের দ্বারে গেছেন, তারা জানেন ফাইল কীভাবে নড়াচড়া করে।

নাগরিকদের সেবা প্রদান করাই সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষকে মৌলিক সেবা পেতেও ঘুষ দিতে হয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির প্রমাণ সামনে আসে। এখানে বেতন বৃদ্ধি কোনো তারতম্য আনেনি, ভবিষ্যতেও আনতে পারবে না। কারণ দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক অভাবের কারণে হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি লোভের ফল।সব সরকারই সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির আলোচনা উঠলেই ‘দুর্নীতি কমবে’-এই যুক্তি সামনে আনে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই যুক্তি কার্যকর নয় এবং টেকসইও নয়। মূলত কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বেতন দশগুণ বাড়ালেও তার সুফল পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ আগেও কয়েকবার সরকারি বেতন কাঠামো সংশোধন করেছে, কিন্তু তাতে কি দুর্নীতি কমেছে?

দুর্নীতি নির্মূল করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। আইনি বিধিবিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের জন্য আলাদাভাবে বড় ধরনের পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে পারে। যেদিন আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব, সেদিন হয়তো ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হবে। তা ছাড়া বেতন বহুগুণ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। ভালো বেতন একটি সহায়ক উপাদান, কিন্তু একক সমাধান নয়। বেতন বৃদ্ধিকে দুর্নীতি কমানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়।

সরকারি কর্মচারীদের প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা সাধারণ নাগরিকদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সরকারি চাকরির বাইরে যারা রয়েছেন, তারা কীভাবে এবং কতটা স্বস্তি ও সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১৫ জুন, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এএসএম