“আজ চারিদিকে বৃষ্টি পড়ছে। পদ্মার জল ধূসর হয়ে এসেছে, আকাশে মেঘের ছায়া, বাতাসে স্নিগ্ধতা। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে ফেলেছে।”
Advertisement
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্র–এর এই অনুভূতিতে ধরা পড়ে বাংলার বর্ষার চিরন্তন সৌন্দর্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বর্ষা এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনে আনন্দ, প্রেম, সৃজনশীলতা এবং প্রাণের সঞ্চার করেছে। আষাঢ়ের প্রথম মেঘ, শ্রাবণের অবিরাম বৃষ্টি, কদমফুলের সুবাস কিংবা নদীর উচ্ছ্বসিত স্রোত—এসব মিলিয়ে বর্ষা বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু প্রকৃতির এই মোহনীয় ঋতু আজ নগরবাসীর কাছে প্রায়ই স্বস্তির চেয়ে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একসময় যে বৃষ্টি ছিল কবিতার উপমা, আজ তা অনেকের কাছে জলাবদ্ধতা, যানজট, রোগবালাই ও ভোগান্তির প্রতীক। আকাশে কালো মেঘ জমলেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা সিলেটের মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়েন—আজ কতটা পানি জমবে, কত ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হবে কিংবা বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে যাবে কি না।
প্রকৃতপক্ষে বর্ষা নয়, আমাদের নগর ব্যবস্থাপনাই আজ সমস্যার মূল উৎস। কারণ বর্ষা তো নতুন নয়; নতুন হলো নগরের সংকট।
Advertisement
বাংলাদেশ মূলত নদীমাতৃক এবং বর্ষানির্ভর একটি দেশ। কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রতিবছর দেশের মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বর্ষাকালে হয়। এই বৃষ্টির পানি কৃষিজমিতে উর্বরতা আনে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করে এবং জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে। অর্থাৎ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বর্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
কিন্তু নগরায়ণের বর্তমান ধারা সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতার পর যেখানে জনসংখ্যার অল্প অংশ শহরে বাস করত, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নগর এলাকায় বসবাস করে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই দশকে এ হার আরও বাড়বে। কিন্তু সেই তুলনায় নগর অবকাঠামো, পরিবেশ পরিকল্পনা এবং জনসেবার উন্নয়ন ঘটেনি।
ফলে বর্ষা এলেই শহরগুলোর সীমাবদ্ধতা নগ্নভাবে প্রকাশ পায়।
রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিতেই বহু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সড়ক অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। নগর অর্থনীতির ওপর এর প্রভাবও কম নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার যানজট ও কর্মঘণ্টা অপচয়ের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যার একটি বড় অংশ বর্ষাকালের দুর্ভোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
Advertisement
এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। শহরের খাল, জলাশয়, নিম্নাঞ্চল এবং প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষম এলাকাগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেছে। একসময় যে খালগুলো অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে প্রবাহিত করত, আজ তার অনেকগুলোই দখল, দূষণ কিংবা অব্যবস্থাপনার শিকার। জলাধার হারিয়ে যাওয়ার ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশনের সুযোগ পায় না।
আজ প্রয়োজন এমন একটি নগর ভাবনা, যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক। কারণ একটি সত্য আমরা যত দ্রুত উপলব্ধি করব, ততই মঙ্গল—বৃষ্টির পানি কোনো শত্রু নয়; শত্রু হলো আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ। আর সেই বাস্তবতা স্বীকার করে যদি আমরা ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা সাজাতে পারি, তবে বর্ষার প্রতিটি ফোঁটা দুর্ভোগ নয়, হয়ে উঠবে একটি আরও বাসযোগ্য, সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি।
এছাড়া অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা জলাবদ্ধতা আরও তীব্র করে তুলেছে। শহরের ড্রেনগুলো প্রায়ই প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে আটকে থাকে। ফলে সামান্য বৃষ্টিও বড় সমস্যার সৃষ্টি করে।
বর্ষাকালের আরেকটি বড় উদ্বেগ জনস্বাস্থ্য। পানি জমে থাকলে মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায় এবং ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও অন্যান্য রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু বাংলাদেশে একটি মৌসুমি অসুখের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এই সংকট আরও জটিল করে তুলছে।
তবে বর্ষাকে কেবল সংকটের উৎস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাস্তবতা হলো, সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা থাকলে বর্ষাই হতে পারে টেকসই নগর উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
বিশ্বের অনেক উন্নত শহর বৃষ্টিকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। সিঙ্গাপুর বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের পানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের চাহিদা পূরণ করে। নেদারল্যান্ডস দীর্ঘদিন ধরে জল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম সফল উদাহরণ। কোপেনহেগেন এবং টোকিও নগর পরিকল্পনায় ‘রেইনওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তারা বুঝেছে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করেই টেকসই নগর গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশেও এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমাদের শহরগুলোতে বাধ্যতামূলক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। বড় ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক প্রকল্পগুলোতে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং কার্যকর করা হলে একদিকে জলাবদ্ধতা কমবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও হ্রাস পাবে।
এছাড়া নগরের খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার করতে হবে। উন্নয়নের নামে জলাধার ধ্বংস করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবিদ, জলবিজ্ঞানী এবং নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রাধান্য দিতে হবে। শুধু ফ্লাইওভার বা উঁচু সড়ক নির্মাণ করলেই একটি শহর আধুনিক হয় না; বরং একটি শহরের প্রকৃত আধুনিকতা নির্ভর করে তার পরিবেশগত সহনশীলতার ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে চরম আবহাওয়া, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ফলে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা অবশ্যই জলবায়ু সহনশীল হতে হবে।
এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিক সচেতনতাও অপরিহার্য। আমরা যদি নিজেরাই ড্রেনে ময়লা ফেলি, জলাশয় দখলকে প্রশ্রয় দিই কিংবা পরিবেশবিধি অমান্য করি, তাহলে কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
বর্ষা আমাদের প্রকৃতির আশীর্বাদ। কিন্তু সেই আশীর্বাদ আমরা কীভাবে গ্রহণ করব, সেটিই আজকের মূল প্রশ্ন। আমরা কি বর্ষাকে প্রতি বছরের দুর্ভোগ হিসেবে মেনে নেব, নাকি এটিকে টেকসই নগর উন্নয়নের সুযোগে পরিণত করব?
প্রতিটি বর্ষা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রকৃতি উপেক্ষা করে উন্নয়ন কখনো স্থায়ী হতে পারে না। যে শহর তার খাল হারায়, সে শহর একসময় তার স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহও হারায়। যে নগর জলাভূমি ধ্বংস করে, সে নগর শেষ পর্যন্ত বৃষ্টির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। তাই বর্ষার আগমন শুধু ঋতুচক্রের একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি আমাদের উন্নয়ন দর্শনের একটি পরীক্ষাও হিসেবে দেখতে হবে।
আজ প্রয়োজন এমন একটি নগর ভাবনা, যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক। কারণ একটি সত্য আমরা যত দ্রুত উপলব্ধি করব, ততই মঙ্গল—বৃষ্টির পানি কোনো শত্রু নয়; শত্রু হলো আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ। আর সেই বাস্তবতা স্বীকার করে যদি আমরা ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা সাজাতে পারি, তবে বর্ষার প্রতিটি ফোঁটা দুর্ভোগ নয়, হয়ে উঠবে একটি আরও বাসযোগ্য, সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/এমএস