মতামত

সীমান্ত, দিগন্ত এবং জনৈক প্রতিমন্ত্রীর ‘অলৌকিক’ কপাল

বাংলার আকাশে-বাতাসে এখন অলৌকিকতার সুবাস। আমরা এতদিন কেবল পীর-আউলিয়ার কেরামতি আর জাদুর চেরাগের গল্প শুনে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে যে আমলাতন্ত্র এবং ভূগোলও আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হতে পারে, দেশবাসী তা জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রত্যক্ষ করল। ধন্য এই সংসদ, ধন্য আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মহোদয়, আর ধন্য তাঁর দুই সুযোগ্য সন্তান—মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত!

Advertisement

ঘটনাটি একটু খোলাসা করে বলা যাক। সংসদে এক বিরোধীদলীয় এমপি, যিনি হয়তো প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের এই আধ্যাত্মিক সংযোগ অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছেন, অভিযোগ তুললেন যে প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকায় তাঁর দুই পুত্রের নামে দুটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। একটির নাম ‘সীমান্ত’, অন্যটির নাম ‘দিগন্ত’। এমপির দাবি, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পুত্রভক্তির এক অনন্য নজির।

কিন্তু আমাদের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যখন ২৭৪ বিধিতে দাঁড়িয়ে তার ‘ব্যক্তিগত কৈফিয়ত’ পেশ করলেন, তখন গোটা সংসদের রথী-মহারথী থেকে শুরু করে গ্যালারির দর্শক পর্যন্ত সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যা বললেন, তার সারমর্ম হলো: এই নামকরণ তিনি করেননি; করেছে স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং অবুঝ সাধারণ জনগণ—গণশুনানির মাধ্যমে! আর তার ছেলেদের নামের সঙ্গে এই নাম মিলে যাওয়াটা কোনো পারিবারিক ষড়যন্ত্র নয়, এটি স্রেফ একটি ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক মিল!

পৃথিবীতে কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে, যেগুলো এতটাই নিখুঁত যে সেগুলোকে কাকতালীয় বলার জন্যও বিশাল সাহস লাগে। যেমন, আপনি যদি প্রতিদিন একই সময়ে লটারি কাটেন এবং প্রতিদিনই প্রথম পুরস্কার পান, তাহলে মানুষ একসময় আপনার ভাগ্য নয়, আপনার যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। ঠিক তেমনি, কোনো জনপ্রতিনিধির দুই সন্তানের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে দুটি ইউনিয়নের নাম হয়ে গেলে মানুষ প্রশ্ন তুলবেই। এটাই স্বাভাবিক।

Advertisement

তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মিরাক্যালি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমার সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। ...কিন্তু ইউনিয়নের নামের আগে তো মীর নাই, মাননীয় স্পিকার।’

আহা! কী অকাট্য যুক্তি! কী সুবিশাল মনস্তত্ত্ব! এই যুক্তির পর আর কোনো কথা চলে? আসুন, প্রতিমন্ত্রীর এই ‘মীর-আক্কেল’ তত্ত্বটি আমরা একটু ব্যবচ্ছেদ করে দেখি।

প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সবচেয়ে জোরালো ডিফেন্স হলো, ইউনিয়নের নামের আগে ‘মীর’ শব্দটা নেই। অর্থাৎ, যদি ইউনিয়নের নাম হতো ‘মীর সীমান্ত ইউনিয়ন’, তবেই কেবল এটিকে তার ছেলের নামে নামকরণ বলা যেত। যেহেতু ‘মীর’ টুকু কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটি সম্পূর্ণ পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক এবং ভৌগোলিক!

এই যুক্তি মেনে নিলে বলতে হয়, ভবিষ্যতে যদি কোনো মন্ত্রী মহোদয়ের ছেলের নাম হয় ‘নদী’ বা ‘আকাশ’ এবং সেই মন্ত্রী যদি তার এলাকায় ‘নদী উন্নয়ন প্রকল্প’ বা ‘আকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ খোলেন, আর সেখানে নিজের উপাধি না লাগান, তবে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয়! আমরা ধন্য যে মাননীয় স্পিকার, প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দয়া করে ইউনিয়নের নাম ‘মীর সীমান্ত’ রাখেননি। তিনি যদি আমলাদের বলতেন, “বাবাজিরা, আগে একটা ‘মীর’ বসিয়ে দাও”, আমলাদের কি সাধ্য ছিল তা অমান্য করার? ডিসি-ইউএনও সাহেবরা তো তখন গণশুনানিতে বলতেন, “যেহেতু এই ইউনিয়নটি গাবতলী সীমান্তে এবং আমাদের মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর ঘরের ভেতরেও একটি মীর সীমান্ত রয়েছে, অতএব দুই সীমান্তকে এক করে এর নাম ‘মীর সীমান্ত’ রাখা হোক!” কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় সেই পথে হাঁটেননি। তিনি ক্ষমতার লোভ সংবরণ করেছেন। তিনি কেবল ‘সীমান্ত’ রেখেছেন। এই ত্যাগের জন্য তাঁকে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক দেওয়া যায় কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

Advertisement

প্রতিমন্ত্রী সাহেবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি ইউনিয়নের নাম হয়েছে সীমান্ত, কারণ সেটি সীমান্তঘেঁষা। অন্যটির নাম হয়েছে দিগন্ত, কারণ সেটি অনেক দূরে। কী চমৎকার! এখন প্রশ্ন হলো, দেশের অন্যান্য ইউনিয়নের নাম কীভাবে রাখা হয়েছিল? যে ইউনিয়নে প্রচুর গরু আছে, তার নাম কি ‘গরু ইউনিয়ন’? যে ইউনিয়নে বেশি কাঁঠাল হয়, তার নাম কি ‘কাঁঠাল ইউনিয়ন’? যে ইউনিয়নে চেয়ারম্যান বেশি বক্তৃতা দেন, তার নাম কি ‘বকবক ইউনিয়ন’?

আচ্ছা, প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সন্তানদের নাম যদি ‘সীমান্ত’ বা ‘দিগন্ত’ না হয়ে ‘ঝন্টু’ ও ‘মন্টু’ হতো, তবে কি আমলারা গণশুনানি করে ইউনিয়নের নাম ‘ঝন্টু ইউনিয়ন’ বা ‘মন্টু ইউনিয়ন’ রাখতেন? তখন ভৌগোলিক ব্যাখ্যা কী হতো? হয়তো বলা হতো, “যেহেতু এই ইউনিয়নের রাস্তাঘাট ঝরঝরে ও নড়বড়ে, তাই এর নাম ‘ঝন্টু’; আর ওই ইউনিয়নের মানুষ একটু মোটা-সোটা, তাই ওটার নাম ‘মন্টু’!”

তা তো হয়নি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই দুটি ক্ষেত্রে এমন নামই বেছে নেওয়া হলো, যা প্রতিমন্ত্রীর দুই পুত্রের নামের সঙ্গে শতভাগ মিলে যায়।

আমাদের দেশের আমলাদের আমরা কম চিনি না। তাঁরা এমন এক বিশেষ প্রজাতি, যাঁদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অত্যন্ত প্রখর। অনেক সময় মন্ত্রী সাহেব কী চান, তা মন্ত্রী সাহেব নিজেও জানেন না। কিন্তু ইউএনও সাহেব জানেন। মন্ত্রী সাহেব কী ভাবছেন, তা তাঁর স্ত্রী জানেন কি না সন্দেহ, কিন্তু ডিসি সাহেব জানেন। এ এক ধরনের রাজনৈতিক টেলিপ্যাথি।

রাজদরবারের যুগে যেমন রাজা কাশি দিলে দশজন মন্ত্রী বলতেন, ‘বাহ! কী সুরেলা কাশি!’ আমাদের আমলাতন্ত্রও অনেক সময় তেমনই সূক্ষ্ম অনুভূতিশক্তির পরিচয় দেয়। হয়তো কোনো এক রাতে কোনো ইউএনও ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভাবলেন, ‘আহা! স্যারের দুই ছেলের নাম সীমান্ত আর দিগন্ত। দেশের সীমান্তও আছে, দিগন্তও আছে। কী অপূর্ব মিল!’ তারপর ভোরে উঠে তিনি গণশুনানির আয়োজন করে ফেললেন। অবশ্য আমরা নিশ্চিত নই। এটা নিছক কল্পনা।

কারণ বাস্তবে সবই হয়েছে জনগণের চাহিদায়। আমাদের জনগণও বড় বিচিত্র। তাঁরা নিত্যপণ্যের দাম কমানোর জন্য আন্দোলন করেন না, রাস্তা মেরামতের জন্য তেমন সরব হন না, কিন্তু ইউনিয়নের নাম রাখার সময় হঠাৎ কাব্যিক হয়ে ওঠেন। তখন তাঁরা বলেন, ‘না ভাই, ইউনিয়নের নাম সীমান্তই হবে!’ অন্য দল বলে, ‘না, দিগন্তই হবে!’ আর তখন গণতন্ত্রের মহোৎসব বসে যায়।

এখন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেল। ধরা যাক, কোনো মন্ত্রীর ছেলের নাম ‘স্বপ্ন’। কিছুদিন পর এলাকায় হলো ‘স্বপ্ন নগর’, ‘স্বপ্ন আবাসন’, ‘স্বপ্ন সড়ক’। সাংবাদিক প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে, ‘দেশ তো স্বপ্ন নিয়েই এগোয়। এখানে ব্যক্তিগত কিছু নেই।’ এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র হবে এক বিশাল পারিবারিক অ্যালবাম। একদিকে থাকবে ভাতিজা ব্রিজ, অন্যদিকে ভাগিনা সড়ক। কোথাও নাতনি পার্ক, কোথাও জামাই মার্কেট। আর সবকিছুর ব্যাখ্যা হবে: ‘এটা নিছক সমাপতন।’

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষ হাসবে, মিম বানাবে, চায়ের দোকানে গল্প করবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির একটি গভীর সত্যও প্রকাশ করে। ক্ষমতা যখন অপ্রতিহত হতে থাকে, তখন ব্যক্তিগত ও সরকারি জগতের মাঝখানের দেওয়ালটি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। নিজের নাম, নিজের ছবি, নিজের পরিবার—সবকিছুই তখন জনপরিসরের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করে। এবং একসময় এমন অবস্থা হয় যে, কেউ প্রশ্ন তুললে উত্তর আসে, ‘কোথায় সমস্যা? নাম তো একই হতে পারে!’

হতে পারে বটে। কিন্তু পৃথিবীতে কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে, যেগুলো এতটাই নিখুঁত যে সেগুলোকে কাকতালীয় বলার জন্যও বিশাল সাহস লাগে। যেমন, আপনি যদি প্রতিদিন একই সময়ে লটারি কাটেন এবং প্রতিদিনই প্রথম পুরস্কার পান, তাহলে মানুষ একসময় আপনার ভাগ্য নয়, আপনার যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। ঠিক তেমনি, কোনো জনপ্রতিনিধির দুই সন্তানের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে দুটি ইউনিয়নের নাম হয়ে গেলে মানুষ প্রশ্ন তুলবেই। এটাই স্বাভাবিক।

তবে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আমাদের নতুন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী জিনিস হলো ব্যাখ্যা। আর ব্যাখ্যার চেয়েও শক্তিশালী জিনিস হলো আত্মবিশ্বাস।

যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি বললেন, ‘ইউনিয়নের নামের আগে তো মীর নাই।’ এই এক বাক্যে তিনি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শনকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাই আজ আমরা বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে বলতে চাই: জয় হোক অলৌকিক ভূগোলের। জয় হোক গণশুনানির কাব্যিকতার। জয় হোক সেই প্রশাসনিক টেলিপ্যাথির, যা মন্ত্রীদের মনের কথা তাঁরা বলার আগেই বুঝে ফেলে।

আর সর্বোপরি, জয় হোক ‘মীর-আক্কেল তত্ত্বের’—যেখানে বংশবাদ মুছে যায় একটি শব্দ কেটে দিলেই, আর ‘কাকতালীয়তা’ এতটাই নিখুঁত হয় যে তাকে দেখে ভাগ্যও লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে!

লেখক : কলামিস্ট।

এইচআর/এমএফএ/এএসএম