দেশজুড়ে

বরগুনায় ২৫ দিনে ১৪ মরদেহ উদ্ধার, জনমনে আতঙ্ক

মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে বরগুনার বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে রয়েছে আলোচিত হত্যাকাণ্ড, রহস্যজনক মৃত্যু, আত্মহত্যা এবং গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনা। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জেলাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

Advertisement

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ৩ জুন। ওইদিন বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর দুটি পৃথক কক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইতি রানী ও তার দুই শিশু কন্যার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুই সন্তানকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ডাকবাংলোতে প্রবেশ করেন ইতি রানী। পরে তারা পৃথক কক্ষে অবস্থান নেন। কয়েক ঘণ্টা পর কেয়ারটেকার এক শিশুকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে দরজা ভেঙে মা ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তা নিয়ে এখনো রহস্য কাটেনি। নিহতের স্বজনরা এটিকে ‌‘হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এর কয়েকদিন পর ৮ জুন বরগুনা সদর উপজেলার গৌরীচন্না বাজার সংলগ্ন বড় খাল থেকে ব্যবসায়ী মো. শামীমের মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ৭ জুন সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন।

১৯ মে আমতলী উপজেলার পশ্চিম চিলা গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ২৬ মে জেলা জজ আদালত চত্বর সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরেক নারীর মরদেহ। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ময়নাতদন্ত শেষে তাকে গণকবরে দাফন করা হয়।

Advertisement

১২ জুন মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে কুপিয়ে আহত করা হয় প্যানেল চেয়ারম্যানকে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে গ্রামবাসী ও তার স্বজনরা মিলে গণপিটুনি ও কুপিয়ে হত্যা করেন কালু বাহিনীর প্রধান হিসেবে পরিচিত ইব্রাহিম হোসেন কালুকে। পরদিন ১৩ জুন পাথরঘাটা উপজেলার একটি সড়কের পাশ থেকে এক রিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে বরগুনা সদরে দুই নারী, বামনায় এক যুবক এবং বেতাগীতে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

১৪ জুন খোদ তালতলী থানা পুলিশের ব্যারাক থেকে ফারুক হোসেন নামে এক পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার কক্ষ থেকে চার পৃষ্ঠার একটি চিঠিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

সবশেষ মঙ্গলবার (১৬ জুন) বরগুনা সদর উপজেলার হেউলিবুনিয়া গ্রামে এলিজা নামের এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার স্ত্রী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় মাস্টার রোলে চাকরি করতো। মারা যাওয়ার আগেও আমি যখন কাজের জন্য বাইরে যাই, ওকে ২০০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলাম বাজার করতে। ও বলছিল, ওর বোনের বাসায় যাবে। কিন্তু দুপুরে শুনলাম আমার দুই সন্তান নিয়ে ও বেঁচে নেই।’

Advertisement

তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো পারিবারিক অশান্তি ছিল না। আমার বাচ্চারাও কখনো ডাকবাংলাতে যায়নি। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

শামীম হত্যার পরে এলাকাবাসী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা টিটু খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘শামীমের মতো এমন নিরীহ মানুষকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে আমরা এলাকাবাসী খুবই আতঙ্কে আছি। শামীমের কোনো শত্রু ছিল না, তাও ওকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।’

বরগুনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে দাবি করে আইনজীবী আব্দুল ওয়াসি মতিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা চাই পুলিশ ও জেলা প্রশাসন, স্থানীয় নাগরিকদের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি সভা করুক। সেখানে আইনশৃঙ্খল পরিস্থিতি কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হোক। চিহ্নিত হত্যাকাণ্ডগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করাও খুব প্রয়োজন।’

একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন সচেতন নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি (সনাক) বরগুনার সাবেক সভাপতি মনির হোসেন কামাল।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বরগুনায় একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক ধরনের অবনতির দিকে যাচ্ছে। এতে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। এতগুলো মরদেহ উদ্ধারের পর তাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ কী, তা এখনো প্রকাশ করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের এমন ভূমিকার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। তারা আস্থা হারাচ্ছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।’

প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি জানিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির আহ্বায়ক ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. নুরুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বরগুনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। বরগুনা বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা যৌথ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।’

এদিকে চলতি মাসে ২২টি মরদেহ উদ্ধার নিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে জেলা পুলিশ। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে দুটি হত্যাকাণ্ড। এছাড়া আত্মহত্যা ১০ জন এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনাজনিত কারণে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বরগুনায় একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা জাগো নিউজকে বলেন, ‘উদ্ধার প্রতিটি মরদেহের ক্ষেত্রে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন এবং আইনানুগ তদন্ত কার্যক্রম চলমান। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতারে জেলা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকে আইনের আওতার বাইরে থাকতে দেওয়া হবে না।’

নুরুল আহাদ অনিক/এসআর/জেআইএম