২০১৮ ও ২০২২’র মতো এবারের বিশ্বকাপের মঞ্চে থাকছেন না রোমান ফুটবল যোদ্ধারা। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে যারা চারবার উড়িয়েছিল শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা। অভিজাত স্রোত থেকে ইতালির ছিটকে পড়ার বেদনা ও শাপ মোচনের শপথ নিয়ে এবার বিশ্বকাপে অন্যরকম চ্যালেঞ্জ কাঁধে বয়ে আনছেন এক রোমান গ্ল্যাডিয়েটর কার্লো আনচেলত্তি। ইতালির বিশ্বখ্যাত মাফিয়া সম্রাটদের অনুকরণে স্প্যানিয়ার্ডরা আদর করে যাকে ‘ডন কার্লো’ নামে ডাকে। ৬৭ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের পুরোটাই যার চ্যালেঞ্জ জয় আর উত্থান-পতনে ভরা।
Advertisement
ফুটবল ক্যারিয়ারে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানের হয়ে জিতেছেন সিরি-আ শিরোপা, দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ১৯৮২’র বিশ্বকাপ জয়ী ইতালির স্কোয়াড থেকে শেষ মুহূর্তে ছিটকে পড়েন ইনজুরির থাবায়। কোচ হিসাবেও বিশ্বকাপ জেতার খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ১৯৯৪’তে মার্কিন মুলুকের বিশ্বকাপ আসরের ফাইনালিস্ট ইতালির সহকারী কোচ হিসেবে ডাগআউটে ছিলেন ডন কার্লো।
বিশ্বকাপ ছাড়া ফুটবলের অন্যান্য সব খ্যাতি তার তালুতে ধরা দিয়েছে অবলীলায়। দুই ইউরোপীয় ফুটবল জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ ও এসি মিলানের হয়ে সর্বমোট পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা একমাত্র কোচ তিনি। কোচ হিসেবে ইউরোপীয় ক্লাব সার্কিটে ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি জয়ের অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী এই সাবেক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। ইউরোপের ‘এলিট ফাইভ’ লিগের সবক’টির শিরোপা জেতার গৌরব একমাত্র তারই।
ক্লাব ফুটবল থেকে পার্থিব সবই পাওয়া ‘ডন কার্লো’ এবার বিশ্বকাপে এসেছেন জাদুকরি ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের ‘বিশ্বকাপ শাপ মোচন’ করাতে। ২০০২’র পেন্টা জয়ের পর থেকে পেলের দেশে চলছে আর বিশ্বকাপ জিততে না পারার হাহাকার। গত দুই যুগে টানা পাঁচ আসর থেকে খালি হাতে ফিরছে ‘সাম্বা-রাজারা’।
Advertisement
এরমধ্যে চারবার কোয়ার্টার এবং ২০১৪’তে দেশের মাটিতে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ‘সেভেন-আপ’-এর দুঃসহ স্মৃতি ব্রাজিলীয়দের শান্তির ঘুম কেড়েছে। বিশ্বকাপে নক-আউট রাউন্ড আর ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী মানেই সেলেসাওদের থেমে যাওয়া, এটা যেন প্রথায় পরিণত।
২০১৯’র কোপা আমেরিকার পর আর কোনো ট্রফি জিততে না পারা পেলে-গারিঞ্চা ও রোনালদিনহোদের দেশ এবার বুঝেছে সাম্বা ফুটবলের রোমান্টিসিজমের সঙ্গে ইউরোপের বিজ্ঞানভিত্তিক পেশাদারি ও হিসাবি ফুটবলের রূঢ় বাস্তবতা মিশেলে যুতসই কৌশলই তাদের ‘মিশন হেক্সা’ স্বপ্নপূরণী ছেড়ে রিও ডি জেনিরোর ‘ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার’ বেদীতে সমর্পিত হওয়ার একমাত্র সমাধান।
২০২৫’র মে মাসে ব্রাজিলের দীক্ষাগুরু হতে রাজি করানো গেছে ফুটবল ইতিহাসের অদ্বিতীয় দ্রোণাচার্যকে, যিনি যোগো বোনিতোর রাজকুমারদের দিচ্ছেন হেক্সা জয়ের মন্ত্র।
তবে বর্তমান বাস্তবতা এবং অতীত ইতিহাস, কোনোকিছুই ব্রাজিল ও কার্লো আনচেলত্তির পক্ষে নেই। ফিফা র্যাংকিংয়ের ছয় নম্বরে থাকা ব্রাজিলকে এবারের আসরে ফেবারিট ভাবছেন না কেউ। অপটাম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সুপার কম্পিউটারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এবার ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা ৬.৪৮ শতাংশ। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র, এই বাস্তবতাকে যেন আরও পরিস্ফুট করে তুলেছে।
Advertisement
এ দৌড়ে ব্রাজিলের চেয়ে এগিয়ে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল। স্কোয়াডে অনেক ফাঁক-ফোকর, দুর্বলতা। রবার্তো কার্লোস, কাফু, মার্সেলো, জুনিয়রের মতো ফুলব্যাকস নেই। আছে আক্রমণভাগ, মিডফিল্ডে চোখে পড়ার মতো ঘাটতি।
বিশ্বকাপ জিততে প্রয়োজন রোনালদো, রোনালদিনহো, মেসি, ম্যারাডোনার মতো সুপারস্টার। এমন চ্যাম্পিয়ন ক্যারিশম্যাটিক ফুটবলার বর্তমান ব্রাজিল দলে নেই। যারা আছেন, তাদের সামনে কলি থেকে ফুল হয়ে ফোঁটার বিশাল চ্যালেঞ্জ।
ইনজুরিপ্রবণ নেইমার শেষ পর্যন্ত মাঠে নিয়মিত নামতে পারবেন কিনা, তাও নিশ্চিত নয়। অতীত ইতিহাসও মুখ ফিরিয়ে আছে ব্রাজিল বা আনচেলত্তির দিকে।
৯৬ বছরের ইতিহাসে বিদেশি কোচ কোনো দেশকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি। সেই বাস্তবতা মেনে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, পর্তুগাল, উরুগুয়েসহ সাত দেশ নতুন ইতিহাস গড়তে বিদেশি কোচ নিয়ে বিশ্বকাপের আসরে হাজির হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বকাপ পর্বে এবারই প্রথম ব্রাজিল ফেভারিটের চাপ নিয়ে খেলতে নামছে না, এটা কার্লো আনচেলত্তির জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির।
তবে দল ব্যর্থ হলে ভক্তরা তুলকালাম বাঁধাবে জেনেও ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের বিচক্ষণ কর্তারা কার্লো আনচেলত্তির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ২০৩০’র পরের আসর পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। ৪৮ দলের এবারের আসরে একমাত্র আনচেলত্তির চটজলদি চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সাড়ে ২১ কোটি জনসংখ্যার প্রায় সবাই নিজেকে মহা ফুটবলবোদ্ধা ভাবা ব্রাজিলের মতো দেশ কেন ইউরোপীয় কার্লো আনচেলত্তির ওপর এত আস্থা রাখছে?
প্রশ্নের উত্তরও খুব সহজ। দুর্ধর্ষ টেকটিশিয়ান, ফর্মেশনে ফ্লেক্সিবিলিটি আনতে দক্ষ কার্লোর কোচিংয়ের মূল সম্পদ ম্যান-ম্যানেজমেন্ট বা ফুটবলারদের সঙ্গে চমৎকার ‘আন্তঃসম্পর্ক’। দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার জানেন, তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।
২০২১ থেকে ২০২৫’এ কোচিংয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে ইনজুরিতে জর্জরিত রিয়াল মাদ্রিদে তিনি পরিচিত পজিশনে খেলতে অভ্যস্ত তারকাদের অনভ্যস্ত পজিশনে খেলিয়ে দলকে জিতিয়েছেন দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ মোট ১১টি ট্রফি। সেন্টার মিডফিল্ডার কামাভিঙ্গাকে লেফট ফুলব্যাক, ভালভার্দেকে রাইট ব্যাক, চুয়ামেনিকে সেন্টার ব্যাক, উইঙ্গার ভাসকুয়েজকে রাইট ফুলব্যাকে খেলিয়ে ইনজুরির আঘাত সামলে দলকে এনে দিয়েছেন ট্রফি।
লুকা মদ্রিচ, ক্যাসেমিরো ও টনি ক্রুজের সমন্বয়ে তৈরি করেছিলেন এক ভয়ংকর মিডফিল্ড ট্রায়ো, যা দুই মেয়াদে আনচেলত্তি ও রিয়াল মাদ্রিদকে জিতিয়েছে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি। পিওর নাম্বার নাইন করিম বেনজেমাকে কখনো একটু নিচ থেকে অপারেট করা বা ‘ফলস নাইন’-এ খেলিয়ে প্রতিপক্ষকে সফলভাবে ধোঁকা দেওয়ার নজিরও আছে আনচেলত্তির।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, ভালভার্দে ও ক্যাসেমিরোর সামর্থ্যের শতভাগ নিংড়ে নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। দলকে প্রেসিং-কাউন্টার প্রেসিংয়ে খেলাতে খুব বেশি আগ্রহী নন তিনি, আস্থা রাখেন ফুটবলারদের সহজাত দক্ষতায়। ৪-৩-৩ ফর্মেশন পছন্দের হলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় ৪-৩-২-১ বা ৪-৪-২ ফর্মেশনেও সুইচওভার করেন।
মাঠে চরম উত্তেজনার মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখার বিরল গুণ আছে এই ট্যাকটিশিয়ানের। প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারেন, ‘ট্যাকটিকস নয়, ফুটবল ম্যাচ জেতায় ফুটবলাররা।’
ইনজুরিপ্রবণ নেইমারের দক্ষতা কতটা ব্যবহার বা ব্রাজিলের ফুটবল স্টাইলকে কতটা বাস্তবসম্মত ফলাফলনির্ভর করতে পারেন আনচেলত্তি, তার দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা দুনিয়া। ফলদায়ক কৌশলের পাশাপাশি ব্রাজিলের ফুটবলের চিরন্তন সৌন্দর্য বজায় রাখার দায়ও বহন করতে হবে তাকে।
ব্রাজিলের আনচেলত্তির বৈশিষ্ট্যের একেবারে বিপরীতমুখী ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেল। ৫৩ বছর বয়সী সাবেক ফুটবলার টুখেলকে সেরা ও ব্যতিক্রমী ট্যাকটিশিয়ান বলে ফুটবল দুনিয়া। বায়ার্ন, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, পিএসজি, চেলসির মতো দলকে কোচিং করানোসহ ১১টি ট্রফি জেতানোর রেকর্ড আছে তার।
এরমধ্যে চেলসিকে জিতিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। পিএসজিকে তার কোচিংয়ে ২০২০ সালে প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান। প্রেসিং, কাউন্টার প্রেসিং ফুটবলের অনুরাগী টুখেল অনুশীলনেও ব্যতিক্রমী ড্রিলিং করাতে পছন্দ করেন।
একাগ্রতা বাড়াতে ফুটবলারদের আর্চারি দলের সঙ্গে অনুশীলন করিয়েছেন, প্রতিপক্ষের প্রেসিং থেকে বাঁচতে ফুটবলারদের টেনিস বলে ফুটবল খেলার অনুশীলন করিয়েছেন। নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপযুক্ত ফুটবলার বাছতে তিনি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে পালমার, ফিল ফোডেন, আলেকজান্ডার আর্নল্ডের মতো তারকাদের বাদ দিয়েছেন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের ডাগআউটের বস হিসেবে এবার থাকছেন ৫৩ বছর বয়সী স্প্যানিয়ার্ড রবার্তো মার্তিনেজ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পর্তুগিজদের দায়িত্ব নেওয়ার আগে মার্তিনেজ বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্মের’ সঙ্গে কাজ করেছেন।
২০১৮’র বিশ্বকাপে মার্তিনেজের কোচিংয়ে বেলজিয়াম তৃতীয় হয়। তার সময়ই বেলজিয়াম ২০১৮ থেকে ২০২২ সময়কালে ফিফা র্যাংকিংয়ে টানা শীর্ষস্থান ধরে রাখে। দায়িত্ব নেওয়ার পর পর্তুগালকে জিতিয়েছেন ইউয়েফা নেশন্স ট্রফি।
ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে নামী তারকাদের নিয়ে গড়া পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ‘সি-আর সেভেনের’ ভূমিকা নিয়ে মার্টিনেজ আঁটছেন বিশেষ পরিকল্পনা। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও উরুগুয়ে দলের দুই আর্জেন্টাইন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো এবং মার্সেলো বিয়েলসার কৌশল ও সাফল্যের দিকে তাকিয়ে থাকবে ফুটবল দুনিয়া।
আইএইচএস/