বিশ্বকাপের আলোয় আমরা দেখি গোল, ট্রফি আর নায়কদের গল্প; কিন্তু সেই উজ্জ্বল মঞ্চের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেকটি ইতিহাস- উপনিবেশ, অভিবাসন, পরিচয় আর আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। ফুটবলের জার্সিগুলো শুধু একটি দেশের প্রতীক নয়; অনেক সময় সেগুলো বহন করে শত বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক যাত্রার গল্প।
Advertisement
২০২৬ বিশ্বকাপে সেই গল্প আবারও সামনে এসেছে। কারণ আলজেরিয়ার জার্সিতে দেখা যাচ্ছে লুকা জিদানকে। তার বাবা, কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান ছিলেন ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক। অথচ তার ছেলে বেছে নিয়েছেন আলজেরিয়াকে। যেন এক প্রজন্মের সিদ্ধান্ত আরেক প্রজন্মে এসে নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
জিনেদিন জিদান জন্মেছিলেন ফ্রান্সের মার্সেইয়ে। কিন্তু তার বাবা-মা ছিলেন আলজেরিয়ার কাবাইল অঞ্চলের মানুষ। ফরাসি জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জিতলেও তিনি কখনো নিজের আলজেরীয় শিকড় অস্বীকার করেননি। বরং বারবার বলেছেন, তিনি একই সঙ্গে ফরাসি এবং আলজেরীয়।
আধুনিক ফরাসি ফুটবলের ইতিহাস আসলে অভিবাসনের ইতিহাসও। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলকে তখন বলা হতো ‘ব্ল্যাক-ব্ল্যাঙ্ক-বেউর’- কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ এবং উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের এক প্রতীকী মিশ্রণ। সেই দলে ছিলেন আলজেরিয়া, সেনেগাল, আর্মেনিয়া ও ক্যারিবীয় শিকড়ের খেলোয়াড়রা।
Advertisement
আজও সেই ধারা অব্যাহত। কিলিয়ান এমবাপের বাবা ক্যামেরুনের, মা আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। পল পগবার পরিবার গিনির, এনগোলো কন্তের বাবা-মা মালির, আর প্যাট্রিক ভিয়েরা জন্মেছিলেন সেনেগালে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনেও আফ্রিকান অভিবাসী পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য।
একই গল্প দেখা যায় বেলজিয়ামে। রোমেলু লুকাকুর বাবা-মা কঙ্গো থেকে এসেছিলেন- এমন এক দেশ, যা একসময় বেলজিয়ামের উপনিবেশ ছিল। লুকাকু বহুবার বলেছেন, বেলজিয়ামের হয়ে খেললেও কঙ্গোর সঙ্গে তার আবেগের সম্পর্ক অটুট। তার ক্যারিয়ার যেন ইউরোপীয় ফুটবলের সঙ্গে আফ্রিকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটি জীবন্ত প্রতীক।
স্পেনের বর্তমান সময়ের সেরা তারকা লামিনে ইয়ামাল কিন্তু স্প্যানিশ নন। তার জন্ম বার্সেলোনার শহরতলীতে। তবে তার বাবা মনির নাসরাউই হলেন একজন মরক্কান। তার মা শেইলা এবানা হলেন আফ্রিকার আরেক দেশ ইকুয়াটেরিয়াল গিনির। কিন্তু জন্ম বার্সেলোনায় হওয়ায় সেখানেই লামিনে ইয়ামাল বেড়ে ওঠেন। তার প্রতিভার স্ফুরণ খুব দ্রুতই প্রকাশ পায়। স্পেনও এমন প্রতিভাকে হারাতে চায়নি। দ্রুত নাগরিকত্ব দিয়ে নিজেদের আলয়ে ভিড়িয়ে নেন।
নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভিন্ন নয়। সুরিনাম ছিল ডাচ উপনিবেশ। সেই সুরিনামি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের অবদান ছাড়া ডাচ ফুটবলের ইতিহাস কল্পনা করা কঠিন। এডগার ডেভিডস, ক্লারেন্স সিডর্ফ, প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক অনেক তারকার পরিবারিক শিকড় সুরিনামে।
Advertisement
ইংল্যান্ডের জাতীয় দলেও দেখা যায় একই বাস্তবতা। জুদ বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা বা মার্কাস রাশফোর্ডদের প্রজন্ম এমন এক ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করে, যার সামাজিক কাঠামো গড়ে উঠেছে সাম্রাজ্যের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা মানুষের অবদানে।
তবে এই গল্প শুধু উপনিবেশিক শক্তিগুলোর নয়; এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্পও।
লিওনেল মেসি মাত্র ১৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে চলে যান। বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠেন, স্প্যানিশ নাগরিকত্বও পান। স্পেন তাকে নিজেদের জাতীয় দলের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করেছিল; কিন্তু মেসি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তার কাছে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সির আবেগ ছিল অন্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে।
আবার উল্টো উদাহরণও আছে। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা মেসুত ওজিল তুর্কি বংশোদ্ভূত হলেও খেলেছেন জার্মানির হয়ে এবং বিশ্বকাপ জিতেছেন। অন্যদিকে জার্মানিতে জন্ম নেওয়া অনেক ফুটবলার পরবর্তীতে তুরস্কের জার্সি বেছে নিয়েছেন নিজেদের শিকড়ের টানে।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিচয়ের এই দ্বন্দ্ব আরও জটিল হয়েছে। জামাল মুসিয়ালা ইংল্যান্ড ও জার্মানি- দুই দেশের হয়েই খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন জার্মানিকে। ডেকলান রাইস আয়ারল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পর ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। আবার হাকিম জিয়েশ নেদারল্যান্ডসের যুবদলে খেলেও পরে মরক্কোর প্রতিনিধিত্ব করেন।
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল যাত্রা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় ইউরোপে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা। তবুও তারা বেছে নিয়েছিল নিজেদের পূর্বপুরুষদের দেশকে। সেই সাফল্য দেখিয়েছিল, আধুনিক ফুটবলে পরিচয় শুধু জন্মসনদে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় আবেগ, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের অনুভূতিতে। শুধু তাই নয়, এবারও ব্রাজিলের বিপক্ষে মরক্কোর যে একাদশ মাঠে ছিল, তাদের প্রায় সবারই জন্ম ফ্রান্সে।
গবেষণাগুলোও বলছে, বিশ্বকাপে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের বড় একটি অংশ এসেছে এমন দেশগুলো থেকে, যাদের মধ্যে একসময় উপনিবেশিক সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ আজকের জাতীয় দলগুলোর অনেক গল্পই আসলে শত বছরের অভিবাসনের ধারাবাহিকতা।
কিন্তু প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে- একজন ফুটবলারের প্রকৃত দেশ কোনটি? যেখানে তিনি জন্মেছেন? যেখানে বড় হয়েছেন? নাকি যেখানে তার পরিবারের শিকড়?
লুকা জিদানের আলজেরিয়া বেছে নেওয়া, মেসির আর্জেন্টিনাকে না ছাড়া কিংবা জিয়েশের মরক্কোর প্রতি আনুগত্য- সব গল্পের উত্তর এক নয়। বরং এগুলো প্রমাণ করে, ফুটবলে জাতীয় পরিচয় কোনো সরল সমীকরণ নয়।
বিশ্বকাপে জাতীয় সঙ্গীত বাজে কয়েক মিনিট। কিন্তু সেই জার্সির ভেতরে লুকিয়ে থাকে উপনিবেশ, যুদ্ধ, অভিবাসন, বর্ণবাদ, স্বপ্ন আর আত্মপরিচয়ের বহু প্রজন্মের গল্প।
গোলগুলো ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়। কিন্তু জার্সিগুলোর পেছনে যে ইতিহাস লেখা থাকে, তা আরও গভীর। আর সেই ইতিহাসের নাম—শিকড় বনাম পতাকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব।
টিটিটি/আইএইচএস