প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে। দুদেশের মধ্যে আলোচনায় এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
Advertisement
তিনি জানান, সফরে বিনিয়োগ ছাড়াও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামো ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বাংলাদেশ বিনিয়োগ প্রবাহ এবং বিনিয়োগ সুবিধা শীর্ষক কর্মশালায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) অন্যতম প্রধান উৎস চীন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট একাধিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
Advertisement
তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর সফরে শুধু বিনিয়োগ নয়; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামো ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও আলোচনায় আসবে।
আরও পড়ুন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারে আগ্রহী বাংলাদেশ ও চীনআশিক চৌধুরী জানান, সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হবে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) বাস্তবায়নাধীন চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রকল্পে অগ্রগতি আনা।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ভূমি উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ শুরুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আশা করছি এই সফরের সময় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিষয়ে গ্রাউন্ডব্রেকিং বা কাজ শুরুর মতো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
Advertisement
এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা অঞ্চলে নতুন শিল্পাঞ্চল ও উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণে চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়েও আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।
বিডা চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি বড় চীনা কোম্পানির বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে বাংলাদেশের নতুন বিনিয়োগ সুযোগ তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনা বিনিয়োগকারীদের দেখানো যে এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে যেসব বড় অবকাঠামো ও শিল্প বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেগুলোর সুযোগও আমরা তাদের সামনে তুলে ধরবো।
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রসঙ্গে আশিক চৌধুরী জানান, সরকার বর্তমানে ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে কয়েকটি সরকারি এবং কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল সফলভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আপাতত নতুন করে বড় কোনো গ্রিনফিল্ড অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা নেই।
আরও পড়ুন ভ্যাটসহ স্বর্ণালঙ্কারের দাম নির্ধারণে ক্রেতাদের লাভ না ক্ষতি?তবে বন্ধ শিল্পকারখানার বড় জমিগুলোকে শিল্পাঞ্চল বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পুরনো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের জমি ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
কর্মশালায় বিডার নির্বাহী সদস্য ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রোচি বলেন, চলতি বছরে নতুন করে এক দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রস্তাব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিডা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবীর এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম।
কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক নূরজাহান আখতার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং বিনিয়োগ প্রবাহ শীর্ষক উপস্থাপনায় বলেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে আসা মোট এফডিআইয়ের ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ ছিল পুনঃবিনিয়োগ করা মুনাফা। অর্থাৎ দেশে কার্যরত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মুনাফার বড় অংশ বাংলাদেশেই পুনরায় বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে মোট এফডিআইয়ের মধ্যে ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ ছিল নতুন ইক্যুইটি মূলধন এবং ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল আন্তঃকোম্পানি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, পুনঃবিনিয়োগের উচ্চ হার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহের প্রতিফলন। একই সঙ্গে আন্তঃকোম্পানি ঋণ স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
উপস্থাপনায় বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির চিত্রও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী এফডিআই প্রবাহ ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় এক দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে উন্নত অর্থনীতিতে এফডিআই প্রবাহ ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৭২৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে এফডিআই ২ শতাংশ কমে ৮৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এসএম/কেএসআর