সীমান্তজুড়ে পুশ-ইন ইস্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলা দিয়ে নারী-পুরুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে কড়া নজরদারির কারণে অনেক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও এ কাজে সীমান্ত এলাকার কিছু দরিদ্র মানুষকে অর্থের প্রলোভনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
Advertisement
জানা গেছে, সীমান্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, বিজিবির টহলের সময় ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, এমনকি সুবিধাজনক রুট দেখিয়ে দেওয়ার মতো কাজেও কিছু লোককে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা আরও সংগঠিতভাবে চালানো হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর সীমান্তে গিয়ে জানা গেছে, সীমান্তঘেঁষা নদীপথগুলো এখন নতুন কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। আগে যেসব এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া কিংবা স্থলপথে কড়াকড়ি ছিল, এখন সেখানে নদীপথকে ব্যবহার করে রাতের অন্ধকার কিংবা ভোরের সময় পুশ-ইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন একাধিক ঘটনার তথ্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র কিছু বাংলাদেশিকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এসব কাজে ব্যবহার করছে বিএসএফ।
Advertisement
‘সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইন কার্যক্রমে কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী- একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিএসএফের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব পুশইনে সহায়তা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, বিজিবির টহলের সময় ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, এমনকি সুবিধাজনক রুট দেখিয়ে দেওয়ার মতো কাজেও কিছু লোককে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একজনকে পুশ-ইন করতে পারলে দেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা আরও সংগঠিতভাবে চালানো হচ্ছে।
তবে সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইনের চেষ্টা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং যেকোনো পুশ-ইনের চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
Advertisement
প্রথমে কিছু সদস্য সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যমে বিজিবির টহল ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে সংগৃহীত তথ্য স্থানীয় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অন্য প্রান্তে থাকা সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ওই তথ্য ব্যবহার করে পুশ-ইনের সময় ও পথ নির্ধারণ করা হয়, যাতে নিরাপত্তা এড়িয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়। পুশ-ইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশে সহায়তার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে একাধিক স্তরের লোক জড়িত থাকে বলে দাবি করা হচ্ছে।
রোকনপুর সীমান্তঘেঁষা গ্রামের নগরপাড়া। সীমান্তের একেবারে কোলঘেঁষা এই গ্রামটি এখন আলোচনায়, কারণ এখানকার সাতজন ব্যক্তিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে পুশ-ইনে সহায়তার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
‘সীমান্তের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বিএসএফের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তাদের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতির বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান হয়। বাংলাদেশে কাউকে পুশ-ইন করতে পারলে ব্যক্তি প্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।’
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত এলাকার কিছু ব্যক্তির সঙ্গে বিএসএফ সদস্যদের গোপন যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এসব ব্যক্তি সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির অবস্থান, টহলের সময়সূচি ও গতিবিধি সম্পর্কিত তথ্য বিএসএফকে জানিয়ে দিতেন।
একই গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বাবুল বলেন, সীমান্তের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বিএসএফের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তাদের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতির বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে কাউকে পুশ-ইন করতে পারলে ব্যক্তি প্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অর্থের লোভে একটি চক্র সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং তারা অবৈধভাবে মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশে সহায়তা করছে।
আরও পড়ুন ‘সীমান্তে সবাই সজাগ আছি’অন্যদিকে একই এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, এসব বিষয়ে ক্যামেরার সামনে বিস্তারিত বলা সম্ভব না।
তিনি অভিযোগ করেন, এখানকার চোরাকারবারিরা অনেক ক্ষমতাবান। তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি একটি চক্র পুশইন প্রক্রিয়ায় বিএসএফকে সরাসরি সহায়তা করছে। এই চক্রের প্রভাব এতটাই বেশি যে প্রকাশ্যে কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি এসব চক্র সরাসরি বিএসএফের সঙ্গে ভিডিও কলে কথাও বলেন।
‘সীমান্তে বিএসএফ গরিব ও অসহায় মানুষদের টার্গেট করছে। গতকাল রাতে পাঁচজনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়। তবে পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ঘটনার পেছনে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক জড়িত ছিল, যারা বিএসএফকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে।’
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একই এলাকার বাসিন্দা বলেন, সীমান্ত এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে, যারা মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে পুশ-ইন কার্যক্রমেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে। এসব ঘটনায় সীমান্তে বিজিবির গতিবিধি বিএসএফের কাছে অর্থের বিনিময়ে পাচার করা হয়।
তবে বিজিবি বলছে, সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কেউ যেন টাকার প্রলোভনে পড়ে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। তবে সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইসলাম মাসুম জাগো নিউজকে বলেন, সীমান্তে বিএসএফ গরিব ও অসহায় মানুষদের টার্গেট করছে। গতকাল রাতে পাঁচজনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়। তবে পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ঘটনার পেছনে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক জড়িত ছিল, যারা বিএসএফকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে।
সীমান্ত এলাকায় কিছু দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কার্যক্রমে সহায়তা করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশ-ইনে সহায়তা করার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশিদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। পরে এমন অভিযোগে ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে যেভাবেই চেষ্টা করা হউক, পুশ-ইন ঠেকাতে কাজ করছে বিজিবি।
আরও পড়ুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত / নারী-শিশুসহ ২০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা, বাধার মুখে ফেরত নিলো বিএসএফচাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.এন.এম. ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইন কার্যক্রমে কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী- একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিএসএফের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব পুশইনে সহায়তা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং কারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এমনকি এমন অভিযোগে ৭ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এনএইচআর/এএসএম