বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত হাজারো মার্কিন নাগরিক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাজনৈতিক হতাশা, কর ব্যবস্থার জটিলতা এবং বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের মতো নানা কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
Advertisement
নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী এরিন ক্ল্যাট তাদেরই একজন। ২০১৬ সালে ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় নিউজিল্যান্ডে যাওয়ার পর তিনি সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। দুগ্ধ খামারে কাজ করতে গিয়ে তিনি তার ইংরেজ স্বামীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরে দুজনই নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
চলতি বছরের শুরুতে ক্ল্যাট আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। সে সময় নাগরিকত্ব ত্যাগের ফি ছিল ২ হাজার ৩৫০ ডলার। বর্তমানে এ ফি কমিয়ে ৪৫০ ডলার করা হয়েছে।
ক্ল্যাট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার আবেগগত সম্পর্ক খুব বেশি ছিল না। পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে হতাশ ছিলেন। বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের ওপর করের বোঝাও তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
Advertisement
বাড়ছে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন
যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, এ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আমেরিকান ওভারসিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮৮৯ জনের নাম নাগরিকত্ব ত্যাগকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ সংখ্যা। সংগঠনটি ধারণা করছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর নাগরিকত্ব ত্যাগের হার প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
সংস্থাটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ডান ডারলাখার জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন নাগরিক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন বা প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।
Advertisement
দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া
মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ একটি আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়া। এতে বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে উপস্থিত হয়ে শপথ পাঠ করতে হয়।
ক্ল্যাট জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে বেশ সময় লেগেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে আবেদন করার পর তিনি অক্টোবর মাসে প্রথম জবাব পান। পরে ২০২৬ সালের মার্চে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে মার্কিন কনস্যুলেটে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন।
তার ভাষায়, নাগরিকত্ব ত্যাগের পর তিনি স্বস্তি ও মুক্তির অনুভূতি পেয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি আমার সিদ্ধান্তে খুবই সন্তুষ্ট। কোনো অনুশোচনা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক নয়, বরং আর্থিক।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কর ও আইনি পরামর্শ প্রতিষ্ঠান টিগারম্যানের বিশেষজ্ঞ জোনাথন ডি. টিগারম্যান বলেন, বিদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের সারা বিশ্বের আয় সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রে কর-সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে করও পরিশোধ করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের মাত্র দুটি দেশের একটি, যারা নাগরিকদের অবস্থান নির্বিশেষে বৈশ্বিক আয়ের ওপর কর-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। অন্য দেশটি হলো আফ্রিকার ইরিত্রিয়া।
২০১০ সালে প্রণীত ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট বিদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডারলাখার বলেন, তাদের কাছে আসা অধিকাংশ মানুষ রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং কর ব্যবস্থার কারণে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা ভাবছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কর ব্যবস্থার কারণে আগামী কয়েক বছরেও মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রবণতা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
এমএসএম