ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এখন শুধু ইউরোপের রাজনীতিতেই নন, বিশ্বজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কখনও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে, আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ কূটনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে বারবার শিরোনাম হচ্ছেন তিনি।
Advertisement
ট্রাম্পের মন্তব্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি
সবশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন। এমনকি তিনি মন্তব্য করেন, মেলোনির জন্য ‘দুঃখবোধ’ থেকেই তিনি ছবি তুলতে রাজি হয়েছিলেন।
এই বক্তব্য ইতালিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মেলোনি অভিযোগটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে একে ‘সম্পূর্ণ মনগড়া’ বলে উল্লেখ করেন।
Advertisement
আরও পড়ুন>পর্নসাইটে নিজের ছবি দেখে বেজায় ক্ষেপলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রীরোমে মোদী ও মেলোনির একান্ত মুহূর্তের ছবি প্রকাশ
তবে সেখানেই থেমে থাকেননি ট্রাম্প। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আরও কড়া ভাষায় মেলোনির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ইতালি প্রত্যাশিত সমর্থন দেয়নি। এমনকি তিনি দাবি করেন, সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে ইতালির সামরিক অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হয়নি।
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সফল হওয়ার পর মেলোনি আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চাইছেন, যাতে নিজ দেশের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা যায়।
এই মন্তব্যের পর ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু মেলোনিকে নয়, পুরো ইতালিকেই অপমান করেছে।
Advertisement
ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্যেই আবারও আলোচনায় এসেছে ‘মেলোডি’
জি-৭ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও জর্জিয়া মেলোনির সংক্ষিপ্ত কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রুপ ফটো তোলার আগে দুই নেতা উষ্ণ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে হাস্যরসের ছলে মেলোনি বলেন, ‘আমরাই ইনস্টাগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি।’
মূলত মোদী ও মেলোনির নাম মিলিয়ে তৈরি ‘মেলোডি’ শব্দটি গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জনপ্রিয় ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।
এর শুরু ২০২৩ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮-এ। তখন মেলোনি মোদীর সঙ্গে একটি সেলফি পোস্ট করে ‘মেলোডি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেছিলেন। এরপর থেকেই দুই নেতাকে ঘিরে অসংখ্য মিম, ভিডিও এবং পোস্ট তৈরি হতে থাকে।
পরবর্তীতে রোম সফরে মোদী মেলোনির জন্য ভারতের জনপ্রিয় ‘মেলোডি’ টফিও উপহার হিসেবে নিয়ে যান, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
জেলেনস্কিকে ঘিরে ভাইরাল ভিডিও
জি-৭ সম্মেলনের আরেকটি ভিডিওও ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। সেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং মেলোনির সাক্ষাতের একটি মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
ইউরোপে গালে গাল ছুঁইয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক রীতি। কিন্তু ভিডিওটিতে দেখা যায়, শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় দুজনের মধ্যে সামান্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অভিনব অভ্যর্থনা
মেলোনিকে ঘিরে এর আগেও বেশ কয়েকটি ঘটনা ভাইরাল হয়েছিল।
২০২৫ সালে আলবেনিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামা বৃষ্টির মধ্যে হাঁটু গেড়ে তাকে স্বাগত জানান। সেই দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।
এরও আগে আবুধাবিতে এক অনুষ্ঠানে রামা প্রকাশ্যে হাঁটু গেড়ে বসে মেলোনিকে জন্মদিনের উপহার দেন। অনেকেই ঘটনাগুলোকে কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে ‘অতিরিক্ত আন্তরিকতা’ হিসেবে দেখেছিলেন।
পর্নসাইটে ছবি নিয়ে ক্ষোভ
ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনার একটি ঘটে ২০২৫ সালে। সে সময় একটি পর্নসাইটে নিজের এবং আরও কয়েকজন নারীর ছবি দেখতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেলোনি।
ঘটনাটিকে তিনি ‘জঘন্য’ বলে উল্লেখ করেন এবং দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন>পর্নসাইটে নিজের ছবি দেখে বেজায় ক্ষেপলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রীরোমে মোদী ও মেলোনির একান্ত মুহূর্তের ছবি প্রকাশ
সাধারণ পরিবার থেকে দেশের নেতৃত্বে
১৯৭৭ সালে রোমে জন্ম নেওয়া জর্জিয়া মেলোনির শৈশব সহজ ছিল না। মাত্র এক বছর বয়সে তার বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। এরপর মায়ের কাছেই বড় হন তিনি।
কৈশোরেই রাজনীতিতে যুক্ত হন মেলোনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ডানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের যুব শাখায় যোগ দেন। ধীরে ধীরে ইতালির রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
২০০৮ সালে তিনি দেশের ইতিহাসে অন্যতম কনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তার দলের ভোট ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে ২০২২ সালে ইতালির প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
কেন এত আলোচনায়?
বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনির জনপ্রিয়তার পেছনে যেমন রয়েছে তার রাজনৈতিক অবস্থান, তেমনি রয়েছে তার ব্যক্তিত্ব এবং জনসমক্ষে উপস্থিতির ধরন। ইউরোপের ডানপন্থি রাজনীতির অন্যতম মুখ হিসেবে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
ফলে কখনও ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, কখনও মোদীর সঙ্গে ‘মেলোডি’, আবার কখনও ভাইরাল ভিডিও—সব মিলিয়ে জর্জিয়া মেলোনি এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নেতাদের একজন।
এমএসএম