দেশের ব্যাংক খাতের ‘ক্যানসার’ হিসেবে পরিচিত খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালে বেড়েছে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি। এ সময় মোট সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশই পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, জাহাজ নির্মাণসহ অন্য উৎপাদনমুখী শিল্পে।
Advertisement
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
২০২৪ শেষে ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। বিতরণ করা এসব ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০ দশমিক ২০ শতাংশ।
এক নজরে পাঁচ বছরের খেলাপি ঋণ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা (৮ দশমিক ১৬ শতাংশ)। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ অংক লাফিয়ে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় (২০ দশমিক ২ শতাংশ) পৌঁছে যায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
Advertisement
উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। আগের বছর একই সময়ে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯৮ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।
দেশীয় উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বড় ধাক্কা পান বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতির সময়। পরে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করে কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের উৎপাদন খাতে।-বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের মতো কারণে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অর্থ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসে না।
পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ ৫৯ হাজার কোটি টাকার বেশিপ্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদনমুখী শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে তৈরি পোশাক খাতে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৯ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা।
Advertisement
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে টেক্সটাইল খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। আগের বছর এ অংক ছিল ৩৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা।
চামড়া ও জাহাজ নির্মাণশিল্পেও উচ্চ খেলাপিচামড়া খাতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণ ছিল ১৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা খেলাপি। আগের বছরের তুলনায় এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৫৭ কোটি টাকা।
জাহাজ নির্মাণশিল্পে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৮১ কোটি টাকা বেশি।
কৃষিভিত্তিক শিল্পে সবচেয়ে বড় লাফপ্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৩ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা, যা বিভিন্ন শিল্পখাতের মধ্যে অন্যতম বড় বৃদ্ধি।
ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে বড় উল্লম্ফনব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৩০ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে বেড়েছে ৭৬ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা।
উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত খেলাপি ঋণের হার এক অংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সে তুলনায় বাংলাদেশের উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।-ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বৈশ্বিক নানা সংকটের ধারাবাহিক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি চাপে পড়ে এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে অনেক কারখানা কার্যক্রম সীমিত করতে বা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
আরও পড়ুন অলস পড়ে আছে বহু বাণিজ্যিক স্পেস, খেলাপি ঋণ বাড়ার শঙ্কাবাংলাদেশের নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশীয় উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বড় ধাক্কা পান বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতির সময়। পরে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের উৎপাদন খাতে।’
এসব কারণে অনেক উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন বলে জানান ফজলে শামীম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘উন্নত দেশে সাধারণত খেলাপি ঋণের হার এক অংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সে তুলনায় বাংলাদেশের উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল বায়েস জাগো নিউজকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়ছে এবং টিকে থাকতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।’
তার মতে, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব শিল্পে বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।
ইএআর/এএসএ/এমএফএ