বাবা দিবস আজ বিশ্বের বহু দেশে একটি পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ দিন। কিন্তু এই দিনটির শুরুটা ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত একটি অনুভূতি থেকে এক সন্তানের তার বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ থেকে। ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তিগত উদ্যোগই পরিণত হয় একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দিবসে।
Advertisement
বাবা দিবসের ইতিহাসের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহর থেকে। ১৯০৯ সালে এক নারী, সোনোরা স্মার্ট ডডে তার বাবাকে সম্মান জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের প্রস্তাব দেন। তার বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট ছিলেন একজন গৃহযুদ্ধের প্রবীণ সৈনিক এবং একক অভিভাবক হিসেবে ছয় সন্তানকে বড় করে তুলেছিলেন। মায়ের অনুপস্থিতিতে তিনি যেভাবে সন্তানদের লালন-পালন করেছিলেন, সেটিই সোনোরাকে অনুপ্রাণিত করে।
সোনোরা স্মার্ট ডড প্রথমে চেয়েছিলেন মাদার্স ডের মতোই বাবাদের জন্যও একটি আলাদা দিন থাকুক। স্থানীয় চার্চ ও সামাজিক সংগঠনগুলো তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে। শেষ পর্যন্ত ১৯১০ সালের ১৯ জুন স্পোকেন শহরে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালন করা হয়। এটিকেই ফাদারস ডে বা বাবা দিবসের ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত আয়োজন হিসেবে ধরা হয়।
সেই প্রথম বাবা দিবসের আয়োজন ছিল খুবই সাধারণ কিন্তু আবেগঘন। চার্চে বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে বাবাদের সম্মান জানানো হয়। শিশুদের মাধ্যমে বাবাদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠি ও কৃতজ্ঞতার বার্তা পাঠ করা হয়। অনেক সন্তান তাদের বাবাকে ফুল, ছোট উপহার বা হাতে বানানো কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। পুরো আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাবাদের ত্যাগ, দায়িত্ব ও নিঃশব্দ ভালোবাসাকে সম্মান জানানো।
Advertisement
প্রথম দিকের এই উদ্যোগ যদিও দ্রুত জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বাবা দিবস ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অনেকেই শুরুতে এটিকে বাণিজ্যিক উদ্যোগ মনে করলেও, সময়ের সঙ্গে মানুষের আবেগই এটিকে শক্ত ভিত্তি দেয়। অবশেষে ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাবা দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ছুটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এরপর ধীরে ধীরে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারতসহ অনেক দেশই জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে বাবা দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে। যদিও কিছু দেশে তারিখ ভিন্ন, তবে উদ্দেশ্য একই বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা।
বাবা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, এটি একটি অনুভূতির প্রতিফলন। সমাজে বাবারা সাধারণত নীরব ভূমিকা পালন করেন। তারা সরাসরি আবেগ প্রকাশ না করলেও পরিবারের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। এই পরিশ্রম ও ত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই এই দিনটি এত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের দিনে বাবা দিবসকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের আয়োজন দেখা যায় স্কুলে বিশেষ অনুষ্ঠান, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা, পারিবারিক মিলন এবং উপহার বিনিময়। তবে এর মূল বার্তা এখনো একই রয়ে গেছে ‘বাবাকে সময় দেওয়া এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।’
Advertisement
প্রযুক্তি ও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি একজন নীরব নায়ক, যিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার পেছনে নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেন। তাই বাবা দিবসের প্রকৃত অর্থ হলো সেই নীরব ভালোবাসাকে অনুভব করা এবং সেটিকে প্রকাশ করতে শেখা।
প্রথম সেই ছোট্ট উদ্যোগ থেকে শুরু হয়ে আজ বাবা দিবস একটি বিশ্বজনীন আবেগে পরিণত হয়েছে। আর এর মূল শিক্ষা একটাই ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন নেই, তবে একটি দিন অন্তত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যাদের কারণে আমরা আজ দাঁড়িয়ে আছি, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা কতটা জরুরি।
সূত্র: হিস্টোরি ডটকম, ব্রিটানিকা, ন্যাশনাল টুডে
কেএসকে