ফিচার

বাবা দিবসের খেরোখাতা

সাব্বির হোসাইন

Advertisement

​শত ঝড়-ঝাপটা, রোদ-বৃষ্টির মাঝেও যে মানুষটি পরিবারের ওপর এক ফোঁটা তপ্ত রোদ লাগতে দেন না, তিনিই বাবা। মাথার ওপর বিশাল আকাশের মতো যার নিঃস্বার্থ স্নেহ আর পায়ের নিচে নিরেট মাটির মতো যার ভরসা সেই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর বিশেষ দিন আজ, বিশ্ব বাবা দিবস।

প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হলেও, সন্তানের কাছে বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন হয় না। ৩৬৫ দিনই বাবার জন্য। তবুও এই একটি দিন যেন আলাদা করে মনে করিয়ে দেয়, কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ ও চিরন্তন আশ্রয়টির কথা।​​বাবা দিবসের সূচনার পেছনে রয়েছে এক কন্যার গভীর ভালোবাসা, শূন্যতা ও কৃতজ্ঞতার গল্প। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ১৯১০ সালের ১৯ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে প্রথম বাবা দিবস পালন করা হয়। সোনারা স্মার্ট ডড নামের এক নারী এই দিবসের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। তাঁর মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়ার পর, তার বাবা উইলিয়াম স্মার্ট একাই সোনারা ও তাঁর অন্য পাঁচ ভাইকে পরম মমতায় বড় করে তোলেন।

​বাবার এই অসীম ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে সোনারার মনে হয়েছিল, মায়েদের মতো বাবাদেরও একটা সম্মাননার দিন থাকা উচিত। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন জুনের তৃতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস ঘোষণা করেন এবং ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এটিকে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় বার্ষিক মর্যাদায় রূপ দেন।​​আমাদের বাঙালি সমাজে বাবার চরিত্রটি সাধারণত একটু গম্ভীর, কিছুটা কঠোর কিন্তু ভেতরে এক মহাসমুদ্র সম ভালোবাসায় পূর্ণ। মায়েরা যেখানে ভালোবাসার প্রকাশ করেন প্রকাশ্যে, বাবারা সেখানে আড়ালে চোখের জল মোছেন। সন্তানের সামান্য জ্বর হলে যে বাবা সারারাত বারান্দায় পায়চারি করেন, তিনিই আবার সকালে সুস্থ সন্তানকে দেখে গম্ভীর মুখে কাজে বেরিয়ে যান।

Advertisement

​নিজের ক্ষয়ে যাওয়া জুতো জোড়া কিংবা পুরোনো শার্টটা বদলে নেওয়ার কথা ভুলে গিয়ে যিনি সন্তানের ঈদের নতুন পোশাকটি সবার আগে কিনে আনেন, তিনিই বাবা। সমাজ বদলেছে, করপোরেট সংস্কৃতির ছোঁয়ায় এখন বাবা দিবসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট হয়, কেক কাটা হয়, উপহার দেওয়া হয়; কিন্তু বাবার ত্যাগ আর চিরন্তন রূপটি রয়ে গেছে আগের মতোই অপরিবর্তিত। বাবারা কখনো নিজের সুখের হিসাব মেলান না, সন্তানের হাসিমুখটাই তাদের জীবনের একমাত্র সঞ্চয়।​​মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, একটি শিশুর মানসিক বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার পেছনে বাবার ভূমিকা অপরিসীম। জীবনের প্রথম জটিল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার সময় বাবার একটা মৃদু পিঠ চাপড় কিংবা ‘আমি তো আছি’ বাক্যটি সন্তানের ভেতরের সব ভয় দূর করে দেয়। বর্তমান যুগের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে হয়তো বাবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময়টুকু কমে এসেছে, কিন্তু যে কোনো বিপদে আজও মানুষের মন সবার আগে বাবার কথাই হাতড়ে বেড়ায়।​​বাবারা কখনো প্রতিদান চান না, চান না কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকীত্বে ভোগা মানুষটি শুধু চান সন্তানের একটুখানি সময়, একটু মিষ্টি করে কথা বলা আর একটুখানি খোঁজখবর। বৃদ্ধাশ্রমের বিষণ্ন দেওয়ালে যেন কোনো বাবার দীর্ঘশ্বাস না ঝরে এই হোক এবারের বাবা দিবসের প্রধান অঙ্গীকার। পৃথিবীর সব বাবার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। শুভ বাবা দিবস!

লেখক: শিক্ষার্থী,তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গী

কেএসকে

Advertisement