মাথাব্যথা আমাদের জীবনের খুব সাধারণ একটি সমস্যা-ঘুম কম হওয়া, স্ট্রেস, চোখের চাপ বা পানিশূন্যতার মতো অনেক কারণেই এটি হতে পারে। তাই প্রতিবার মাথা ব্যথা হলেই যে তা ব্রেন টিউমারের লক্ষণ, এমন ধারণা ঠিক নয়। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মাথাব্যথা শরীরের ভেতরে থাকা গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিতও দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী, অস্বাভাবিক বা অন্যান্য স্নায়বিক উপসর্গের সঙ্গে যুক্ত মাথাব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়।
Advertisement
‘টিউমার’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভয় তৈরি হয়। আর যদি সেটি ব্রেন টিউমার হয়, তাহলে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়-অনেকেই ভাবেন, আদৌ কি সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব? বাস্তবে ব্রেন টিউমার আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, খিঁচুনি, চলাফেরায় সমস্যা, কথা বলতে অসুবিধা, স্মৃতিভ্রংশসহ নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে ব্রেন টিউমার যেকোনো বয়সে হতে পারে। তারপরও কিছু নির্দিষ্ট বয়স ও শারীরিক অবস্থায় এর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
আরও পড়ুন পিঠের ব্যথায় ভুগছেন? সমাধান এই ৪ ব্যায়ামে ব্রেন টিউমার কী?ব্রেন টিউমার হলো মস্তিষ্ক বা এর আশপাশে অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। এটি দুই ধরনের হতে পারে যথা- বিনাইন (অক্যানসারাস), ম্যালিগন্যান্ট (ক্যানসারাস)।
টিউমার বড় হলে তা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজে বাধা সৃষ্টি করে এবং আশপাশের অংশে চাপ ফেলে। এতে মাথার ভেতরের তরল চলাচলও ব্যাহত হতে পারে, যা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।
Advertisement
বয়সভিত্তিক ঝুঁকি: ব্রেন টিউমার যে কোনো বয়সে হতে পারে, তবে ধরনভেদে ঝুঁকি আলাদা। শিশুদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট টিউমার যেমন- মেডুলোব্লাস্টোমা বেশি দেখা যায়। ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে গ্লিওব্লাস্টোমার ঝুঁকি বেশি।
পারিবারিক ইতিহাস ও জেনেটিক কারণ: পরিবারে আগে কারও ব্রেন টিউমার হয়ে থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। কিছু বংশগত রোগও এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যেমন-নিউরোফাইব্রোমাটোসিস, টিউবারাস স্ক্লেরোসিস, লি-ফ্রাউমেনি সিনড্রোম, ভন হিপেল-লিনডাউ সিনড্রোমসহ আরও কিছু জেনেটিক অবস্থা।
আরও পড়ুন চুমুর অস্বস্তি থেকেই ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন রঘু রামঅতিরিক্ত রেডিয়েশনের সংস্পর্শ: মাথা বা ঘাড়ে পূর্বে রেডিওথেরাপি নেওয়া থাকলে ভবিষ্যতে ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শৈশবে নেওয়া রেডিয়েশন তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা: যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল যেমন-এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর দীর্ঘদিন ইমিউনোস্যাপ্রেসিভ ওষুধ ব্যবহারকারী তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
Advertisement
স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন কিছু ধরনের টিউমার, বিশেষ করে মেনিনজিওমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অন্য ক্যানসারের উপস্থিতি: ফুসফুস, স্তন, কিডনি, কোলন বা ত্বকের ক্যানসার থাকলে তা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ার (মেটাস্টাসিস) সম্ভাবনা থাকে।
ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ: দীর্ঘদিন কীটনাশক, পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ বা শিল্পকারখানার কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন কাশিতে ভুগছেন? সমাধান আছে আপনার রান্নাঘরেই সাধারণ লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা খিঁচুনি কথা বলা বা চিন্তায় সমস্যা আচরণ বা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন শরীরের এক পাশে দুর্বলতা বা অবশভাব ভারসাম্য হারানো বা হাঁটতে সমস্যা দৃষ্টি বা শ্রবণে পরিবর্তন স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া বিভ্রান্তি বা অচেনা অনুভূতিএ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন জীবনযাপনেই লুকিয়ে পুরুষের বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি ব্রেন টিউমারের ধরনচিকিৎসাবিজ্ঞানে ১২০টিরও বেশি ধরনের ব্রেন টিউমার শনাক্ত করা হয়েছে। প্রধানত এগুলো দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-বিনাইন টিউমার ও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার।
বিনাইন টিউমারধীরে বৃদ্ধি পায়, তবে অবস্থান অনুযায়ী জটিলতা তৈরি করতে পারে।
মেনিনজিওমা: সবচেয়ে সাধারণ, নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় পিটুইটারি অ্যাডিনোমা: হরমোন ও দৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি করে ক্র্যানিওফ্যারিনজিওমা: শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, চোখ ও হরমোনে প্রভাব ফেলে সোয়ানোমা: স্নায়ুর চারপাশে তৈরি হয়, শ্রবণশক্তি ও মুখের ব্যথার কারণ হতে পারে ন্যাসোফ্যারিঞ্জিয়াল অ্যাঞ্জিওফাইব্রোমা: কিশোরদের মধ্যে বেশি, নাক বন্ধ ও রক্তপাত হতে পারে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারদ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
মেডুলোব্লাস্টোমা: শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, সাধারণত সেরিবেলামে হয় গ্লিওব্লাস্টোমা: প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি, অত্যন্ত আগ্রাসী ধরনের টিউমার আরও পড়ুন গরমেও সর্দি-কাশি-গলাব্যথায় ভুগছেন? জানুন প্রতিকারব্রেন টিউমার ভয়াবহ মনে হলেও এটি সবসময় নিরাময় অযোগ্য নয়। দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা এবং সঠিক পরিচর্যা রোগীর জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন অনেক রোগীই দীর্ঘ সময় ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারছেন।
তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার্স অ্যান্ড স্ট্রোক
জেএস/