কৃষি ও প্রকৃতি

কেন হারিয়ে যাচ্ছে জাতীয় পাখি দোয়েল

সাব্বির হোসাইন​গ্রামবাংলার সকালে দোয়েলের চিরায়ত সুমধুর শিষ শুনে মানুষের ঘুম ভাঙতো—সেই চেনা দৃশ্যপট আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় পাখি ‘দোয়েল’ আজ নিজ বাসভূমেই চরম অস্তিত্ব সংকটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতির এ অমূল্য প্রতীক হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু পাখি কমে যাওয়া নয় বরং বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও পরিবেশগত সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়া।

Advertisement

বিলুপ্তির পথে দোয়েল

একসময় গ্রামীণ জনপদে ভোরের আলো ফুটতো সাদা-কালো ডানার চঞ্চল পাখি দোয়েলের ডাকে। এটি শুধু গায়ক হিসেবেই নয়, কৃষকের পরম বন্ধু হিসেবেও পরিচিত ছিল। ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গই দোয়েলের প্রধান খাদ্য। কৃষকদের আলাদা করে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করতে হতো না; প্রকৃতির এই ছোট ছোট ডানাগুলোই নিখরচায় সামলে নিতো পুরো ফসলের মাঠ।

​ঘন জঙ্গল নয়, মানুষের বসতবাড়ির আশপাশ, গাছের কোটর, মাটির ঘরের চালের ফাঁকা জায়গা বা সবজির মাচায় বাসা বাঁধতে ভালোবাসে দোয়েল। কিন্তু আধুনিকায়নের ঝড়ে আজ গ্রামগুলোতে আগের মতো গাছপালা নেই, নেই মাটির ঘর কিংবা খড়ের চাল। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে আধুনিক কৃষিতে।

আরও পড়ুন কোথায় হারালো ‘হুক্কাহুয়া’ সুর, বিপন্ন শেয়াল

ফসলের জমিতে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের প্রধান খাদ্য পোকামাকড় বিষাক্ত হয়ে পড়ছে, যা খেয়ে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছে আমাদের জাতীয় পাখি। জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তন ও ঝড়-বৃষ্টির কারণেও এদের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, যা দোয়েলকে ঠেলে দিচ্ছে বিলুপ্তির অতল গহ্বরে।​মানুষের বসতবাড়ির চারপাশে বিচরণ করা পাখিটি ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনে কাজ করতো। বর্তমানে অতিরিক্ত কীটনাশক, নগরায়ন ও বাসস্থানের অভাবে এটি বিলুপ্তির পথে।

Advertisement

উত্তরণের পথ

​জাতীয় পাখিকে বাঁচাতে হলে আমাদের পরিবেশ নিয়ে ভাবনার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। জমিতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ও জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ জোরদার করতে হবে, যা পাখির খাদ্যচক্রকে নিরাপদ রাখবে। ​সর্বোপরি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন চাঁদপুরে ৭৫ জাতের বিদেশি আম চাষে সফল হেলাল উদ্দিন

দোয়েলের আসল সৌন্দর্য আমাদের মুক্ত আকাশে এবং গহীন অরণ্যের স্বাধীনতায়। যদি আমরা প্রকৃতির এ অতন্দ্র প্রহরীকে বাঁচাতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা বন্ধ্যা, সুরহীন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে অরক্ষিত বাংলাদেশ রেখে যাবো। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এ জাগরণ হোক প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে।

লেখক: শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী।

এসইউ

Advertisement