আন্তর্জাতিক

সংকটে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি, প্রধানমন্ত্রী বদলালেই কি মিলবে সমাধান?

লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে সোমবার (২২ জুন) সকালে রোদঝলমলে আবহাওয়ার মধ্যে নিজের কর্মী ও স্ত্রীকে পাশে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন কিয়ার স্টারমার। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন, যুক্তরাজ্যকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি আর উপযুক্ত ব্যক্তি নন।

Advertisement

ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় নির্বাচনী বিজয় অর্জন করা স্টারমার দুই বছর পূর্ণ করার আগেই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন। গত ১০ বছরে পদত্যাগ করা ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী তিনি। প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে এটি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সর্বোচ্চ হার।

তার আগের প্রধানমন্ত্রীদের মতো স্টারমারও জনজীবনের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে দেশটির জীবনযাত্রার মান কার্যত স্থবির হয়ে আছে। অন্যদিকে করোনা মহামারি ও অন্যান্য বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে জাতীয় ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারি ব্যয়ও কঠোর সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।

অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাও ব্রিটিশ সমাজে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করেছে।

Advertisement

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন বলেন, স্টারমার, লিজ ট্রাস ও বরিস জনসনের মতো নেতারা জনগণের কাছে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরির মতো কোনো সুস্পষ্ট জাতীয় রূপরেখা উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে যুক্তরাজ্য এখন একটি গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহামকে উল্লেখ করে তিনি রয়টার্সকে বলেন, যদি তিনিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ হন, তাহলে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার।

একসময় স্থিতিশীলতার প্রতীক ছিল যুক্তরাজ্য

একসময় যুক্তরাজ্যকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখা হতো। মার্গারেট থ্যাচার ও টনি ব্লেয়ারের মতো নেতারা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে আধুনিক ব্রিটেনের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

Advertisement

থ্যাচার ও ব্লেয়ার মিলিয়ে টানা ২১ বছর দেশ শাসন করেছেন। তাদের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। তবে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট দেশটির অর্থনীতিকে প্রবলভাবে আঘাত করে। কারণ যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল বিশাল আর্থিক খাতের ওপর।

এরপর সরকারি ব্যয়সংকোচন নীতি বা ‘অস্টেরিটি’ কার্যকর করা হয়। কিন্তু সেই নীতি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দেশটিকে প্রস্তুত করতে পারেনি।

২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে টনি ব্লেয়ারই ছিলেন সর্বশেষ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, যিনি অন্য কোনো দলের সমর্থন ছাড়াই নির্বাচনে জয়ী হয়ে পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেছিলেন।

একসময় ইতালির ঘনঘন সরকার পরিবর্তন নিয়ে বিদ্রূপ করতো যুক্তরাজ্য। কিন্তু এখন অনেক ব্রিটিশ নাগরিক ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দিকে ঈর্ষার চোখে তাকান। প্রায় চার বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মেলোনি ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সরকারপ্রধান হওয়ার পথে রয়েছেন।

ব্রেক্সিট নাকি অর্থনৈতিক সংকট- কোথায় শুরু সমস্যার?

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ১০ বছর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে ব্রেক্সিট গণভোটই যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ।

তবে ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা জিল রাটারের মতে, সংকটের শুরু হয়েছিল আরও আগে- ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় থেকে।

তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে তাদের জীবন আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে না। এমনকি তাদের সন্তানদের জীবনও উন্নত হচ্ছে না। আর এরপর আসা প্রতিটি সরকারই সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাজ্য তার দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এই সিদ্ধান্ত স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতা আন্দোলনকেও নতুন করে উসকে দেয়। কারণ স্কটল্যান্ডের অধিকাংশ ভোটার ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, করোন মাহামারি সরকারি ব্যয় ও ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর নেওয়া পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাজ্যের জাতীয় ঋণ জিডিপির প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

যদিও জাপান, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের ঋণ-জিডিপি অনুপাত আরও বেশি, তবুও যুক্তরাজ্যে ঋণ নেওয়ার খরচ তুলনামূলক বেশি। এর কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগ।

এই পরিস্থিতি সরকারি ব্যয় সীমিত করেছে এবং সরাসরি জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

২০২৫ সালে সুপারমার্কেট চেইন অ্যাজডা ও সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে গড় প্রকৃত আয় কিছুটা বাড়লেও সবচেয়ে কম আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ২০২১ সালের তুলনায় কমে গেছে।

কেন কিছুই কাজ করছে না?

সাবেক সরকারি উপদেষ্টা স্যাম ফ্রিডম্যান তার Failed State: Why Nothing Works and How We Fix It বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন যে যুক্তরাজ্য অত্যন্ত কেন্দ্রীয়কৃত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

তার মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো এতটাই ছোট ও সীমিত সক্ষমতার যে তারা বর্তমান সময়ের জটিল চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে পারছে না।

জিল রাটার ও ১৯৮৩ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া যুক্তরাজ্যের দীর্ঘতম মেয়াদি আইনপ্রণেতাদের একজন রজার গেইলও মনে করেন, ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ঘটেছে।

২৪ ঘণ্টার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে রাজনীতিবিদদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

রক্ষণশীল দলের এমপি রজার গেইল রয়টার্সকে বলেন, সরকারের উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমানো। আইন খুব বেশি তৈরি হচ্ছে। এর অনেকগুলোই খারাপ, আর অনেকগুলো খারাপভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাদের আরও পরিণত ও দায়িত্বশীল সরকার প্রয়োজন

বার্নাহামের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

স্টারমারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো, ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান দাম, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির মতো বড় সমস্যাগুলো মোকাবিলায় তার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।

তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহাম, যিনি সর্বশেষ গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষমতায় আসতে পারেন।

ক্ষমতায় এলে তাকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে ও দেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে হবে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে স্টারমারের কাছে পরাজিত সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকও মনে করেন, বার্নহামের একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সানডে টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, তা না হলে তিনিও আরেকজন প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠবেন, যিনি রাত জেগে ভাববেন- কেন কিছুই কাজ করছে না।

সূত্র: রয়টার্স, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এসএএইচ