ফুটবল কখনও অপেক্ষা করে না। এখানে প্রতিটি প্রজন্মের জন্য নতুন নায়ক আসে, নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়। একসময় পেলের জায়গা নিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তার সময় শেষ হওয়ার পর ম্যারাডোনার আলোচনায় এসেছিলেন জিদান, রোনালদো ও রোনালদিনহোরা। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছে মেসি-রোনালদো। কিন্তু সময়ের নিয়ম মেনে সেই অধ্যায়ও শেষ হওয়ার কথা ছিল।
Advertisement
আর নতুন সময়ের নতুন তারকা হিসেবে বিশ্ব ফুটবল খুঁজে পায় দুই নতুন মুখ — কিলিয়ান এমবাপে এবং আরলিং হালান্ড। একজন বিস্ফোরক গতি আর ড্রিবলিংয়ের জাদু নিয়ে, অন্যজন গোল করার যন্ত্রের মতো নির্ভুলতা নিয়ে। ইউরোপের ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চ, সব জায়গাতেই গত কয়েক বছর ধরে তাদের আধিপত্য। অনেকেই ভেবেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে এই দুই তারকার বিশ্বকাপ; এটি হবে নতুন যুগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
কিন্তু সমস্যা একটাই। লিওনেল মেসি এখনও মঞ্চ ছাড়েননি।
গতকাল বিশ্বকাপের আরেকটি দিনে ফুটবলপ্রেমীরা দেখলো এক বিরল দৃশ্য। এমবাপে ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়েকে নকআউটে নিতে হালান্ডও করেছেন জোড়া গোল সেনেগালের বিপক্ষে। বিশ্ব ফুটবলের এই প্রজন্মের দুই তারকা নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন আরেকবার। কিন্তু সেই একই কাজ করলেন ৩৯ বছর বয়সী মেসিও। এটা শুধু একটি ম্যাচের ঘটনা নয়। এটি আসলে ফুটবলের সবচেয়ে বড় বাস্তবতার প্রতীক। যে খেলোয়াড়কে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি সবাই বহু আগেই শুরু করেছিল, তিনি এখনও অবস্থান করছেন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে।
Advertisement
এমবাপে ও হালান্ড এখন ক্যারিয়ারের সেই পর্যায়ে আছেন, যেখানে ফুটবলাররা সাধারণত নিজেদের শীর্ষে পৌঁছান। তাদের শরীর, গতি, শক্তি সবকিছুই আছে সেরা অবস্থায়। অন্যদিকে মেসি এমন এক বয়সে খেলছেন, যে বয়সে পৌঁছানোর আগেই অধিকাংশ কিংবদন্তি অবসরে চলে যান অথবা বেঞ্চের খেলোয়াড়ে পরিণত হণ।
তবে মাঠের পারফরম্যান্সে পার্থক্যটা চোখে পড়ে না বললেই চলে।
কারণ মেসি এখন আর তরুণ বয়সের মতো প্রতি মুহূর্তে দৌড়ান না। তিনি ম্যাচকে পড়েন। জায়গা তৈরি করেন। সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। তার ফুটবল এখন গতি নয়, বুদ্ধিমত্তার শিল্প। আসলে মেসি যখন খেলেন তখন প্রতিপক্ষের কোনো কৌশল কাজ করে না। তিনি অপ্রতিরোধ্য।
ফলে এমবাপে যেখানে প্রতিপক্ষকে হারান বিস্ফোরক গতিতে, হালান্ড যেখানে গোল করেন শক্তি ও পজিশনিং দিয়ে, মেসি সেখানে ম্যাচের ছন্দ বদলে দেন কয়েক সেকেন্ডের জাদুতে। যা মানবীয় কোনো ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব।
Advertisement
তাই এমবাপে ও হালান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গোল করা নয়। ট্রফি জেতাও নয়। বরং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নিজেদের সেরা সময়েও মেসিকে পাশ কাটিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা। যখন এমবাপে বিশ্বকাপ জেতেন, প্রশ্ন ওঠে — তিনি কি মেসির মতো হতে পারবেন? যখন হালান্ড গোলের পর গোল করেন, তখনও আলোচনা হয় — তিনি কি মেসির সংখ্যাগুলো ছুঁতে পারবেন? অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের দুই সেরা তারকার সাফল্যও শেষ পর্যন্ত গিয়ে মাপা হচ্ছে একজন ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইনের মানদণ্ডে।
ফুটবলের ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, কিন্তু তাদের উত্তরসূরিরা সাধারণত নতুন যুগ তৈরি করেছেন। মেসির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। নতুন যুগ শুরু হওয়ার পরও পুরোনো রাজা এখনও সিংহাসনের কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন।
একসময় মেসিকেও একই ধরনের তুলনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। তাকে বলা হতো, তিনি কি ম্যারাডোনার সমান? বিশ্বকাপ জেতার আগে সেই প্রশ্ন তার পুরো ক্যারিয়ারকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন নতুন প্রজন্মকে জিজ্ঞেস করা হয়, তারা কি মেসির সমান হতে পারবে? এই পরিবর্তনই হয়তো একজন খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। কারণ কিংবদন্তি হওয়া এক জিনিস, আর নিজেই তুলনার মানদণ্ড হয়ে ওঠা আরেক জিনিস।
২০২৬ বিশ্বকাপে এমবাপে ও হালান্ড নিজেদের যুগ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ছেন। তারা গোল করছেন, ম্যাচ জেতাচ্ছেন, নতুন ইতিহাস লিখছেন। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি গল্পও চলছে। একজন মানুষরূপী জাদুকর, যিনি তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন, প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে আছেন, তিনি এখনও স্কোরশিটে এমন ভাবে নিজের নাম লিখে যাচ্ছেন যেন মনে হচ্ছে তিনি ছাড়া ফুটবল অসম্পূর্ণ।
হয়তো এ কারণেই মেসিকে নিয়ে আলোচনা কখনও শেষ হয় না। কারণ এমবাপ্পে ও হালান্ড ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর মেসি? তিনি যেন একই সঙ্গে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ।
ফুটবলের মঞ্চে প্রতিপক্ষ বদলায়। জার্সি বদলায়। প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু যখন বিশ্বকাপের আলো জ্বলে ওঠে, তখনও দেখা যায় একটি পরিচিত দৃশ্য — স্কোরবোর্ডে সগৌরবে লেখা আছে, লিওনেল মেসি। আর এটিই হয়তো এই যুগের সবচেয়ে অসাধারণ গল্প।
টিটিটি/আইএন