শনিবার, ২০ জুন। যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকাল গড়িয়ে বেলা প্রায় সাড়ে নয়টা। ওয়েস্ট লাফায়েতের মে ফেয়ার আবাসিক এলাকাজুড়ে তখনো ছুটির শান্ত আবহ বিরাজ করছে। অধিকাংশ বাড়ির জানালা এখনো বন্ধ। চারপাশে ছড়িয়ে আছে গভীর প্রশান্তি। বাসার সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন। শুধু রান্নাঘর থেকেই ভেসে আসছে থালা-বাসনের মৃদু শব্দ। আমার স্ত্রী ময়না আজকের সকালের নাস্তার পাশাপাশি প্রবাসের মাটিতে বাঙালির চিরচেনা জামাই ষষ্ঠীর আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে উপভোগ করছি অনিন্দ্যসুন্দর সকাল। জানালার কাঁচের ওপারে যেন প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকেছে জীবন্ত জলরঙের ছবি।
Advertisement
রাতভর বৃষ্টির স্নানে ধুয়ে যাওয়া ওয়েস্ট লাফায়েতের রাস্তাগুলো ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন। মনে হয়, ভোরের আলো ফুটতেই কেউ নিখুঁত যত্নে ধুয়ে মুছে সাজিয়ে রেখেছে পুরো শহরটাকে। ফুটপাতের সবুজ গাছপালা বৃষ্টির স্পর্শে যেন আরও সতেজ, আরও প্রাণবন্ত। রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ অচেনা গাছগুলো মৃদু বাতাসে দুলছে। তাদের ঝিরঝিরে সবুজ পাতায় সূর্যের আলো চিকচিক করে উঠছে, যেন নীরব হাসিতে তারা নতুন দিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। মাথার ওপরে বিস্তৃত আকাশটি অপূর্ব নীল। সেই নীলের বুকজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তুলোর মতো সাদা মেঘের ছোট ছোট ভেলা। এমন এক সকাল, যা শুধু চোখে নয়, হৃদয়েও গভীর প্রশান্তির রং ছড়িয়ে দেয়।
আরও পড়ুন আটলান্টা থেকে ওয়েস্ট লাফায়েত: পথে পথে জীবনের গল্পসকালের সেই প্রশান্ত পরিবেশে হঠাৎই ঘরের নীরবতা ভাঙলো বড় মেয়ে বানীর কণ্ঠে। মুখভরা হাসি নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে বললো, ‘তোমরা সবাই তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নাও। জামাই ষষ্ঠীর অনুষ্ঠান শেষ করেই আমরা দুপুর দুটোর মধ্যে বেরিয়ে পড়বো।’ ছোট মেয়ে মৃত্তিকা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায় যাচ্ছি আমরা?’ বানী মুচকি হেসে উত্তর দিলো, ‘আজ আমরা ক্যাটারাক্ট ফলস দেখতে যাবো।’ কথাটি শুনেই ছোট্ট বাঁশরী দিদিভাই আনন্দে হাততালি দিচ্ছিল। বেড়াতে যাওয়া তার সবচেয়ে প্রিয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে পিংক রঙের সুন্দর পোশাক পরিয়ে দেওয়া হলো। মাথায় গোলাপি ব্যান্ড, চোখে ছোট্ট কালো সানগ্লাস। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল রঙিন ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো ছোট্ট প্রজাপতি। এরই মধ্যে শুরু হলো দিনের সবচেয়ে আবেগঘন পর্ব। হাজার হাজার মাইল দূরে, জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবাসের ঘরেই উদযাপিত হলো আমাদের চিরচেনা জামাই ষষ্ঠী। ছিল না আত্মীয়-স্বজনের ভিড়, ছিল না বাংলাদেশের সেই উৎসবমুখর কোলাহল। তবু ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না। মায়ের স্নেহ, শাশুড়ির আন্তরিকতা, দুই বোনের হাসি, জামাইকে ঘিরে সবার আন্তরিক যত্ন আর পরিবারের অকৃত্রিম মমতায় মুহূর্তেই ঘর ভরে উঠলো বাঙালিয়ানার উষ্ণতায়। আমেরিকার মাটিতে বসেও যেন বাংলাদেশের চিরচেনা পারিবারিক আবহ ফিরে এলো।
Advertisement
জামাই ষষ্ঠীর আন্তরিক আয়োজন আর পারিবারিক আনন্দঘন মুহূর্ত শেষে এবার বেরিয়ে পড়ার পালা। সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেয়ে ভ্রমণের প্রস্তুতি নিলাম। আমরা মোট সাতজন। তাই দুটি গাড়ির প্রয়োজন হলো। বড় মামনি আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। পাশের অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন ভাস্কর চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক ছাত্র। বর্তমানে পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত। অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র, মেধাবী ও অমায়িক একজন তরুণ। নিজের লাল রঙের গাড়ি নিয়ে তিনিও আমাদের সঙ্গী হলেন। মজার বিষয় হলো, তিনিও আগে কখনো ক্যাটারাক্ট ফলসে যাননি। তার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসলেন তিনি নিজেই। সঙ্গে আমি, সুদীপ্তর মা এবং সুদীপ্তর শাশুড়ি। অন্য গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে সুদীপ্ত। তার সঙ্গে আমার দুই মেয়ে এবং ছোট্ট বাঁশরী দিদিভাই।
দুপুর গড়িয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। ওয়েস্ট লাফায়েত থেকে ক্যাটারাক্ট ফলসের দূরত্ব প্রায় সত্তর থেকে পঁচাত্তর মাইল। পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। কিছুদূর এগোতেই চোখের সামনে উন্মোচিত হলো ইন্ডিয়ানার বিস্তীর্ণ কৃষিভূমির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দিগন্তজোড়া ভুট্টাক্ষেত আর সয়াবিনের সবুজ সমুদ্র যেন চোখের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছিল বিশাল আকৃতির ধাতব শস্যভান্ডার, যেগুলো সাইলো নামে পরিচিত। দূর থেকে দেখতে অনেকটা রুপালি মিনারের মতো। ফসল সংগ্রহের পর দীর্ঘসময় নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য এসব সাইলো ব্যবহৃত হয়। বিশাল খামারের পাশে সারি সারি আধুনিক ট্র্যাক্টর, প্ল্যান্টার, স্প্রেয়ার ও কম্বাইন হারভেস্টার কৃষির পূর্ণ যান্ত্রিকীকরণের সাক্ষ্য বহন করছে। এখানে বীজ বপন থেকে সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, ফসল কাটা, সংরক্ষণ এবং পরিবহন পর্যন্ত প্রায় সব কাজই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। পথের ধারে শস্য পরিবহনের জন্য নির্মিত বিশেষ রেললাইনও চোখে পড়লো। কৃষি যে এখানে প্রযুক্তিনির্ভর ও সুপরিকল্পিত একটি শিল্প, পুরো পথজুড়েই তার বাস্তব চিত্র দেখতে পেলাম।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের লেক মিশিগানের তীরে বিকেলের উপাখ্যানপ্রায় দুই ঘণ্টার মনোরম পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে পৌঁছে গেলাম পুটনাম কাউন্টির লিবার স্টেট রিক্রিয়েশন এরিয়ায়। প্রবেশ করতেই চারপাশের পরিবেশ যেন মুহূর্তেই বদলে গেল। সুউচ্চ বৃক্ষরাজি, শীতল বাতাস, পাখির কলতান আর গভীর সবুজের সমারোহ জানিয়ে দিলো আমরা প্রকৃতির অপূর্ব রাজ্যে এসে পৌঁছেছি। এখানেই অবস্থিত ইন্ডিয়ানার সর্বাধিক জলপ্রবাহসম্পন্ন জলপ্রপাত ক্যাটারাক্ট ফলস। প্রথমেই গেলাম আপার ক্যাটারাক্ট ফলসে। পার্কিং এলাকা থেকে অল্প হাঁটতেই কানে ভেসে এলো জলধারার গর্জন। কয়েক কদম এগোতেই চোখের সামনে ধরা দিলো মিল ক্রিকের বুকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট উচ্চতা থেকে নেমে আসা সাদা ফেনিল জলধারা। পাহাড়ি জলপ্রপাতের মতো খুব উঁচু না হলেও এর বিস্তৃতি ও প্রবল জলপ্রবাহ মুহূর্তেই মুগ্ধ করে। কিছুক্ষণ আমরা সবাই যেন প্রকৃতির মোহে হারিয়ে গেলাম। শুরু হয়ে গেল ছবি তোলার উৎসব। কেউ একক ছবি, কেউ পারিবারিক ছবি, আবার কেউ জলপ্রপাতকে পেছনে রেখে স্মৃতি বন্দি করতে ব্যস্ত। ছোট্ট বাঁশরী দিদিভাই ছিল সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সুযোগ পেতেই সে জলপ্রপাতের অগভীর জলে নেমে হাততালি দিতে দিতে নেচে বেড়াতে লাগলো। তার হাসি আর উচ্ছ্বাসে চারপাশ যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো।
জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগের পর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ক্যাটারাক্ট ফলস কাভার্ড ব্রিজ আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নিলো। উনিশ শতকের শেষভাগে নির্মিত এ কাঠের সেতুটি আজও অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লালচে কাঠের গঠন আর পেছনে সাদা জলধারার অপূর্ব মিলন এটিকে জীবন্ত ছবির মতো করে তুলেছে। কিছুক্ষণ সেই দৃশ্য উপভোগ করে আমরা হাঁটার পথ ধরে এগিয়ে গেলাম লোয়ার ক্যাটারাক্ট ফলসের দিকে। পথজুড়ে ঘন বন, উঁচু নিচু মাটির পথ, বুনো ফুলের ছড়াছড়ি আর পাখির ডাক পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছিল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, মানুষ আর প্রকৃতির এ সম্পর্ক কত গভীর, অথচ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা তা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।
Advertisement
লোয়ার ক্যাটারাক্ট ফলসের সৌন্দর্য উপভোগ শেষে ধীরে ধীরে আমরা ফিরে আসার পথে রওয়ানা দিলাম। ক্যাটারাক্ট ফলস শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয় বরং এটি ইন্ডিয়ানার সবচেয়ে বেশি জলপ্রবাহসম্পন্ন জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকাল কিংবা বরফ গলার সময় এর জলধারা আরও প্রবল ও জীবন্ত হয়ে ওঠে, আর শীতের তীব্র ঠান্ডায় কখনো কখনো চারপাশ বরফে ঢেকে স্বপ্নিল রূপ নেয়। পার্ক কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় অত্যন্ত সচেতন। বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেওয়া আছে, কারণ ভেজা পাথর অনেক সময় বিপজ্জনকভাবে পিচ্ছিল হয়ে থাকে। তাই নির্ধারিত পথেই চলাচল করা নিরাপদ।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছিল। ফেরার পথে গাড়ির জানালা দিয়ে শেষবারের মতো সবুজ বনভূমির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি মানুষের কাছে কিছু চায় না, শুধু একটু সময় আর ভালোবাসা পেলেই সে ফিরিয়ে দেয় নির্মল প্রশান্তি, অপার সৌন্দর্য আর অমূল্য স্মৃতি। হাজার মাইল দূরের প্রবাসে একদিকে জামাই ষষ্ঠীর পারিবারিক উষ্ণতা, অন্যদিকে ইন্ডিয়ানার এ অপরূপ প্রাকৃতিক ভ্রমণ মিলেমিশে দিনটিকে করে তুলেছিল অনন্য জীবনানুভূতি। এমন কিছু দিন সত্যিই থাকে, যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, হৃদয়ের গভীরেও চিরদিনের জন্য গেঁথে যায়।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: এক বিকেল, এক শহর, এক ইতিহাসএসইউ