ফিচার

ম্যাচ শেষ, জানতেন না গোলরক্ষক, ১৫ মিনিট পাহারা দেন গোলপোস্ট

বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় পৃথিবীর চেহারা। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে অফিসের আলোচনা সবখানেই ফুটবল। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়, তারকাদের পারফরম্যান্স, নাটকীয় গোল কিংবা অবিশ্বাস্য সেভ নিয়ে উত্তেজনার শেষ থাকে না। তবে ফুটবল শুধু ট্রফি, গোল বা রেকর্ডের গল্প নয়; এই খেলার ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা অদ্ভুতত্বের কারণে যুগের পর যুগ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

Advertisement

তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ৯ দশক আগে। যে ঘটনা শুনলে আজও অনেকেই অবাক হন। একজন গোলরক্ষক পুরো মাঠ ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরও প্রায় ১৫ মিনিট গোলপোস্ট পাহারা দিয়ে গিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেনই না যে ম্যাচটি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে!

ঘটনার সময়টা ১৯৩৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর, বড়দিনের দিন। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল চার্লটন অ্যাথলেটিক ও চেলসি। শীতকাল হওয়ায় আবহাওয়া ছিল ঠান্ডা, তবে ম্যাচ শুরুর সময় সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক।

চার্লটন অ্যাথলেটিকের গোলপোস্টে ছিলেন স্যাম বারট্রাম। সে সময়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ম্যাচও এগোচ্ছিল স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু কিছু সময় পর প্রকৃতি যেন হঠাৎ করেই খেলাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

Advertisement

আরও পড়ুন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেশগুলোর অদ্ভুত যত উৎসব

স্টেডিয়ামের ওপর নেমে আসে ঘন কুয়াশা। প্রথমে হালকা থাকলেও ধীরে ধীরে সেটি এতটাই ঘন হয়ে ওঠে যে মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। খেলোয়াড়রা একে অপরকে ঠিকমতো দেখতে পারছিলেন না। দর্শকদের অবস্থাও ছিল একই রকম।

পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকায় ম্যাচ কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অবশেষে ম্যাচের ৬১ মিনিটে রেফারি খেলা বন্ধ ঘোষণা করেন। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একে একে সবাই ড্রেসিংরুমে ফিরে যান। দর্শকেরাও স্টেডিয়াম ত্যাগ করতে শুরু করেন।

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই সিদ্ধান্তের খবর পৌঁছায়নি চার্লটনের গোলরক্ষক স্যাম বারট্রামের কাছে। ঘন কুয়াশার কারণে তিনি মাঠের অন্য প্রান্তে কী ঘটছে, তা দেখতে পাচ্ছিলেন না। রেফারির বাঁশির শব্দ কিংবা সতীর্থদের ডাকও স্পষ্টভাবে তার কানে পৌঁছায়নি। তিনি মনে করেছিলেন, খেলা এখনো চলছে এবং তার দল হয়তো প্রতিপক্ষের অর্ধে আক্রমণে ব্যস্ত।

ফলে তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। গোললাইন ধরে হাঁটাহাঁটি করেন, মাঝে মাঝে চারপাশে তাকান এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণের অপেক্ষা করতে থাকেন। তার কাছে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। অথচ বাস্তবে তখন মাঠে আর কেউ ছিল না।

Advertisement

আরও পড়ুন ফুটবল খেলা দেখার সময় কোন দেশের মানুষ কী খায়?

ম্যাচ বন্ধ হওয়ার প্রায় ১৫ মিনিট পরও তিনি একা দাঁড়িয়ে ছিলেন গোলপোস্টের সামনে। পুরো স্টেডিয়াম প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছে তখন। কুয়াশার চাদরে ঢাকা মাঠে একমাত্র মানুষ হিসেবে তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত মাঠে টহলরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি লক্ষ্য করেন। কুয়াশার মধ্যে একা একজন খেলোয়াড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি এগিয়ে যান এবং বারট্রামকে জানান যে ম্যাচ অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে, খেলোয়াড় ও দর্শকরা সবাই চলে গেছেন।

আরও পড়ুন ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ডের ধারণা এলো যেভাবে

কথাটি শুনে হতভম্ব হয়ে যান বারট্রাম। এতক্ষণ তিনি যে সম্পূর্ণ ফাঁকা মাঠে একাই গোলপোস্ট পাহারা দিচ্ছিলেন, তা বিশ্বাস করতে তারও কষ্ট হচ্ছিল। তিনি আরও বেশি অবাক হয়েছিলেন তার দলের কেউ তাকে এসে জানায়নি।

পরে এই ঘটনা ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। স্যাম বারট্রাম নিজেও জীবনের বিভিন্ন সময়ে ঘটনাটি স্মরণ করেছেন। ফুটবলের শত শত ম্যাচ, হাজারো গোল এবং অসংখ্য রেকর্ড সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও এই গল্প আজও সমান জনপ্রিয়।

বর্তমানে বিশ্বকাপের উত্তেজনায় যখন সারা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক চোখ রাখছেন মাঠের দিকে, তখন ফুটবলের এমন গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয় এই খেলার সৌন্দর্য শুধু ট্রফি জয়ে নয়, বরং এর অসংখ্য মানবিক, হাস্যকর ও অবিশ্বাস্য মুহূর্তেও লুকিয়ে আছে।

হয়তো এবারের বিশ্বকাপেও আমরা দেখব নতুন কোনো নাটকীয় ঘটনা, অবিশ্বাস্য গোল কিংবা রূপকথার মতো কোনো গল্প। কিন্তু ঘন কুয়াশার মধ্যে ১৫ মিনিট ধরে একা গোলপোস্ট পাহারা দেওয়া স্যাম বারট্রামের সেই ঘটনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

সূত্র: গলফ নিউজ, টাইমস অব ইন্ডিয়া

কেএসকে