ইমরান শাকির ইমরু
Advertisement
টানা বৃষ্টি। আষাঢ় মাসের গভীর রাত। আকাশে একটি তারাও দেখা যায় না। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি চারদিককে এক মুহূর্তের জন্য সাদা করে দেয়। তারপর আবার সবকিছু গিলে ফেলে ঘন কালো অন্ধকার। চাঁদপুরের হরিণা চরের কেউ আষাঢ়ের রাতে ঘর থেকে বের হয় না। সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়। গ্রামের বয়স্করা বলেন, ‘আষাঢ়ের রাতে যদি কেউ তোমার নাম ধরে ডাকে, কখনো সাড়া দিও না। সে মানুষ নয়।’
ছোটরা এই কথা শুনে ভয় পায়। গ্রামের পাশে একটি পুরোনো ঘাট আছে। সবাই একে কালীগো ঘাট বলে চেনে। অনেক বছর আগে এক ভয়ংকর ঝড়ের রাতে যাত্রীভর্তি একটি নৌকা সেখানে ডুবে যায়। মাঝি আর যাত্রী—কেউ বাঁচেনি। লাশও সব পাওয়া যায়নি। তারপর থেকেই শুরু হয় অদ্ভুত সব ঘটনা।
মাঝরাতে নাকি নদীর বুক থেকে বৈঠা চালানোর শব্দ শোনা যায়। কেউ কেউ কালীগো ঘাটে সাদা কাপড় পরা এক মাঝিকে নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। কিন্তু এসব কথা নাঈম কখনো বিশ্বাস করতো না। সে বলতো, ‘ভূত বলে কিছু নেই। সব মানুষের বানানো গল্প।’ একদিন বাজারে কাজ শেষ হতে অনেক রাত হয়ে গেল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। চারদিকে কাদা। অন্য রাস্তা দিয়ে গেলে অনেক দূর ঘুরে যেতে হবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো, কালীগো ঘাটের পাশ দিয়েই বাড়ি ফিরবে।
Advertisement
নাঈম হাঁটতে লাগলো। বৃষ্টির শব্দে চারদিক ভরে গেছে। কাদায় পা ডুবে যাচ্ছে। দূরে মেঘনা নদী গর্জন করছে। হঠাৎ মনে হলো, তার পেছনে কেউ হাঁটছে। ছপ... ছপ... ছপ...। সে থেমে গেল। পেছনে তাকালো। কেউ নেই। আবার হাঁটতে শুরু করতেই সেই শব্দ। এবার যেন আরও কাছে। তার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠলো। নিজেকে বুঝ দিলো, না, এটা শুধু আমার ভুল ধারণা। কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ব্যাঙের ডাকও নেই।
শুধু নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে শরীর কাঁপিয়ে দিলো। ঠিক তখনই একটি কণ্ঠ ভেসে এলো। ‘নাঈম...’। সে থেমে গেল। আবার ডাকলো, ‘নাঈম... ওপারে যাবি?’ সে চারদিকে তাকালো। কেউ নেই। আবার সেই ডাক। ‘আয়! যাবি?’
সে ধীরে ধীরে নদীর দিকে তাকালো। দেখলো, নদীর মাঝখানে একটি পুরোনো নৌকা। নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সাদা কাপড় পরা এক মাঝি। সে হাত নেড়ে তাকে ডাকছে। বৃষ্টির মধ্যেও তার কাপড় ভিজছে না। নৌকাটাও নদীর স্রোতে নড়ছে না। নাঈমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আরও পড়ুন বাবা দিবসের গল্প: জীবনের স্থপতিঠিক তখনই আকাশে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো। এক ঝলক আলোয় সে মাঝির মুখের দিকে তাকালো। দেখলো মাঝির মুখ নেই! যেখানে মুখ থাকার কথা; সেখানে শুধু গভীর কালো অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ভেতরে জ্বলছে অসংখ্য ছোট ছোট চোখ। সবগুলো চোখ একসঙ্গে নাঈমের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর একসঙ্গে হাসতে শুরু করলো। এ দৃশ্য দেখে নাঈমের বুকের রক্ত যেন জমে গেল।
Advertisement
নাঈম প্রাণপণে দৌড় দিলো। দৌড়াতে দৌড়াতে সে বুঝলো, কিছু একটা ঠিক নেই। সে যতই দৌড়ায়, ততই যেন কালীগো ঘাটের কাছেই ফিরে আসে। হঠাৎ তার কাঁধে বরফের মতো ঠান্ডা একটা হাত পড়লো। নাঈম চিৎকার করে উঠলো। তারপর আর কিছু মনে নেই।
পরদিন ভোরে গ্রামের কয়েকজন জেলে নদীর পাড়ে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলো। জ্ঞান ফেরার পর নাঈম আর আগের মতো ছিল না। সে খুব কম কথা বলতো। কেউ কালীগো ঘাটের কথা বললেই কাঁপতে শুরু করতো। কয়েক মাস পর সে হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যায়। আজও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন দীপংকর দীপকের দুটি অনুগল্পএসইউ