উত্তরা হাউজবিল্ডিং মোড়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা, গাড়ির হর্ন আর ধুলোমাখা নগরজীবনের অস্থিরতা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি লোকাল বাস। প্রতিটি বাসের সামনে চেনা দৃশ্য হেলপারের চিৎকার, ‘যাত্রাবাড়ী! সায়েদাবাদ! মতিঝিল!’ কোথাও যাত্রী নিয়ে টানাটানি, কোথাও ভাড়া নিয়ে তর্ক, কোথাও আবার কে আগে উঠবে সেই ধাক্কাধাক্কি। রাজধানীর লোকাল বাসে চলাচল করা মানুষদের কাছে এসব খুব পরিচিত দৃশ্য। বাসে ওঠার আগেই যেন মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয় আজও হয়তো কারো সঙ্গে কথা কাটাকাটি হবে, হয়তো হেলপারের রুক্ষ আচরণ শুনতে হবে, কিংবা ভাড়া নিয়ে অযথা বিতর্কে জড়াতে হবে।
Advertisement
ঢাকা শহরের লোকাল বাসের চিত্র কল্পনা করলেই চোখে ভেসে ওঠে এক জীর্ণ, বিশৃঙ্খল এবং অব্যবস্থাপনায় ভরা পরিবেশ। সেই পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কয়েকজন মানুষ একজন ড্রাইভার, একজন কন্ডাক্টর এবং একজন হেলপার। সাধারণত রাজধানীর অনেক লোকাল বাসে এই তিনজনের ভাষা হয় কর্কশ; দিনভর যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়া, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা, ভাড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, এমনকি বাসের ভেতরেই ধূমপানের দৃশ্যও নতুন কিছু নয়। যাত্রীরা যা-ই বলুক, অনেক সময় যেন তাতে তাদের ভ্রুক্ষেপ থাকে না। তারা যেন বুঝে নিয়েছেন এই পেশার নিয়মই এমন।
আরও পড়ুন বাজারের ভিন্ন এক ব্যস্ততা, মাছ কেটেই চলে তাদের জীবিকাসেই পরিচিত বাস্তবতার মধ্যেই চোখে পড়ল রাইদা কোম্পানির একটি বাস। সেখানে নেই হৈ-হুল্লোড়, নেই ভাড়া নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি-হট্টগোল কিংবা তর্কাতর্কি। আশ্চর্যের বিষয় হলো যাত্রীদের মাঝেও নেই বিরক্তির ছাপ। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন ছুটে চলা অধিকাংশ লোকাল বাসের ভেতরে থাকে অস্থিরতা, চিৎকার আর যাত্রীদের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু রাইদা কোম্পানির এই বাসটিতে যেন অন্য এক দৃশ্য। বিশৃঙ্খলার শহরে ছোট্ট এক প্রশান্তির দ্বীপের মতো।
এই ভিন্ন পরিবেশের পেছনে রয়েছেন দুইজন মানুষ একজন ড্রাইভার, অন্যজন হেলপার।বাসের পাদানিতে পা রাখতেই অচেনা এক অনুভূতি হলো। যেন ভুল করে ঢাকার কোনো লোকাল বাসে নয়, অন্য কোথাও উঠে পড়েছি। ‘আসসালামু আলাইকুম, আসেন ভাই সাহেব।’ কথাটা শুনে কিছুটা থমকে যেতে হয়। ঢাকার লোকাল বাসে এমন সম্বোধন খুব একটা শোনা যায় না। লোকাল বাসে উঠলে সাধারণত কানে আসে হেলপারের কর্কশ ডাক ‘সামনে যান!’, ‘ভাড়া দেন!’, ‘দাঁড়ায়েন না!’এর মাঝেই ধাক্কাধাক্কি, তর্ক, বিরক্তি। কিন্তু এখানে চিত্রটা ভিন্ন।
Advertisement
মাথা তুলে তাকাতেই দেখা গেল চালকের আসনে বসা মধ্যবয়সী একজন মানুষ। পরনে জুব্বা, মাথায় টুপি, মুখে শান্ত এক হাসি। তিনি মো. আবু বক্কর রাজু মিয়া। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেও তিনি নতুন ওঠা যাত্রীদের দিকে খেয়াল রাখছেন। কেউ উঠলে সালাম দিচ্ছেন, কাউকে ‘হুজুর’, কাউকে ‘হজরত’, কাউকে ‘ভাই সাহেব’, আবার কাউকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছেন।
ঢাকার অন্য অনেক লোকাল বাসচালকের সঙ্গে তার পার্থক্য প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়। কোথাও কোনো রুক্ষতা নেই, নেই কর্কশতা কিংবা অশোভন আচরণ। চারপাশের বাস্তবতায় তিনি যেন গোবরে পদ্মফুলের মতো। রাজধানীর অন্য অনেক লোকাল বাসচালকের তুলনায় তার চলন-বলন, আচার-আচরণ ও ব্যবহার যেন আলাদা। কী অমায়িক ব্যবহার তার!
আরও পড়ুন ২০০ বছর আগের এক দুর্ঘটনা থেকেই দেয়াশলাইর আবিষ্কারকথোপকথনে জানা গেল, মোহাম্মদ আবু বক্করের বয়স প্রায় ৪০ বছর। এর মধ্যে প্রায় ১৫ বছর কাটিয়েছেন পরিবহন খাতে। কর্মজীবনের প্রথম পাঁচ বছর ছিলেন হেলপার। এরপর ধীরে ধীরে হয়েছেন ড্রাইভার। ড্রাইভার হিসেবে কাজ করার সময় ২০২০ সালের দিকে তিনি তাবলীগ জামাতের সঙ্গে তিন দিনের জন্য সময় দিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার পর তার চিন্তাধারায় আসে পরিবর্তন।
আবু বক্কর বলেন, ‘মানুষকে ঠকিয়ে জেতা যায় না। মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করেও ভালোভাবে পেশা পরিচালনা করা যায়। সমঝোতা করেও পথ চলা সম্ভব। ড্রাইভিং হোক কিংবা অন্য কোনো কাজ খারাপ ব্যবহার বা অশোভন আচরণ কোনো পেশার জন্যই ঠিক নয়।’
Advertisement
তিনি আরও বলেন, ‘ড্রাইভারি পেশায় থাকলেই সবাইকে একই রকম হতে হবে এমন কোনো বিধান নেই। তাবলীগের সঙ্গে থেকে বুঝেছি, মানুষের দোয়া নিয়ে ভালোভাবে থাকাটাও ঈমানের অংশ। অন্যরা কী করছে, সেটা অনুসরণ না করে আল্লাহর দেখানো পথ অনুসরণ করাই উত্তম। আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি।’
যেমন ওস্তাদ, তেমন শিষ্যবাসটি চলছিল। বাড্ডা থেকে কয়েকজন যাত্রী উঠলেন। সাধারণত এমন সময়ে অনেক বাসেই শুরু হয় চেনা দৃশ্য ভাড়া নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলা, টাকা নিয়ে তর্ক কিংবা উত্তেজনা। কিন্তু এখানে ভিন্ন কিছু দেখা গেল। একজন যাত্রী ভাড়া দিতে গিয়ে বললেন, ‘ভাই, আমার কাছে দুই টাকা কম আছে।’ হেলপার মুচকি হেসে বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, সমস্যা নাই।’ কোনো বিরক্তি নেই, কোনো উচ্চস্বরে কথা নেই।
প্রচলিত একটি কথা আছে ‘যেমন গাছ তেমন ফল’, ‘যেমন ওস্তাদ তেমন শিষ্য’। সেই প্রবাদের বাস্তব চিত্রও দেখা গেল এই বাসে। ড্রাইভার আবু বক্করের মতোই সুন্নতি ধাঁচের পোশাকে চলাফেরা করেন ওই বাসের হেলপার মো. নূর নবী। ওস্তাদের মতো তার শরীরেও জুব্বা, মাথায় টুপি। কারো সঙ্গে জোরজবরদস্তি করেন না, কোনো কটু কথাও বলেন না। মুখে সবসময় হাসি। বাসভাড়া নিয়ে নেই তর্কাতর্কি কিংবা রুক্ষ ব্যবহার।
আরও পড়ুন ফুটবল খেলা দেখার সময় কোন দেশের মানুষ কী খায়?ভাড়া চাওয়ার সময়ও তার কণ্ঠে থাকে নরম সুর। কাউকে বুঝিয়ে বলছেন, কাউকে আবার হাসিমুখে এক-দুই টাকা ছাড়ও দিচ্ছেন। তারও এমন পরিবর্তিত আচরণের পেছনে রয়েছে ইসলামি মূল্যবোধের চর্চা। কথা বলতে বলতে জানা গেল, ওস্তাদ-শিষ্যের এই জুটি শুধু পেশাগত নয়, জীবনদর্শনেও যেন একে অন্যের সঙ্গী।
নূর নবী বলেন, ‘ওস্তাদের মতো আমিও তাবলীগের সাথী। যখনই সময় পাই, আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। হয়তো সেই বদৌলতেই অন্য হেলপারদের তুলনায় একটু ভিন্নধর্মী জীবনধারায় অভ্যস্ত হতে পেরেছি।’
যাত্রীদের চোখেও প্রশংসাশুধু ড্রাইভার-হেলপার নয়, এই বাসের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট যাত্রীরাও। বাসের ভেতরে বসে থাকা যাত্রীদের মধ্যেও তাদের আচরণ নিয়ে প্রশংসা শোনা গেল। উত্তরা থেকে মতিঝিলগামী বেসরকারি চাকরিজীবী রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার লোকাল বাসে উঠলে সাধারণত একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই উঠতে হয় এখন ঝগড়া হবে, ভাড়া নিয়ে তর্ক হবে। কিন্তু এই বাসে উঠে অবাক হয়েছি। তারা খুব সম্মান দিয়ে কথা বলেন।’
একই বাসের যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাবরিনা আক্তার বলেন, ‘লোকাল বাসে মেয়েরা অনেক সময় অস্বস্তিতে থাকেন। কিন্তু এখানে পরিবেশটা অন্যরকম। কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি।’
আরেক যাত্রী আব্দুল করিম বলেন, ‘আসলে ভালো ব্যবহার মানুষের মন জয় করে। ভাড়া দুই-এক টাকা কমবেশি হলে মানুষ সেটা ভুলে যায়, কিন্তু ব্যবহার খারাপ হলে সেটা মনে থাকে।’
আরও পড়ুন বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা, এক কেজির দাম কোটি টাকা বিশৃঙ্খলার মাঝেও অন্যরকম এক শিক্ষারাজধানীর পরিবহন খাত নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রতিদিনের যাত্রাপথে মানুষকে সহ্য করতে হয় নানা ধরনের অসংগতি। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় ছুটে চলা অধিকাংশ বাসই হয়তো মানুষের কাছে বিরক্তির প্রতীক। তবে সেই একই রাস্তায় রাইদা কোম্পানির একটি বাস যেন নীরবে বলে যাচ্ছে এমন মানুষই হয়তো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় বহন করেন।
বাসটি তখন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। জানালার বাইরে ঢাকা শহরের চিরচেনা ব্যস্ততা। রাস্তাজুড়ে অসংখ্য বাস ছুটে চলেছে কোথাও হর্ন, কোথাও চিৎকার, কোথাও অস্থিরতা। কিন্তু এই একটি বাসের ভেতরে যেন অন্য এক পৃথিবী। ঢাকার বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থার মাঝেও আবু বক্কর আর নূর নবীর মতো মানুষরা হয়তো নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছেন পেশা মানুষকে বড় করে না, মানুষই পেশাকে সম্মানিত করে।
কেএসকে