দেশজুড়ে

বৃষ্টি হলেই থাকে না বিদ্যুৎ, বিপাকে কুড়িগ্রামের মানুষ

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা মৌসুমে সামান্য ঝড় কিংবা হালকা বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকাটা যেন এ জেলার মানুষের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে।

Advertisement

ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম সদর, চর রাজিবপুর, রৌমারী, চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী ও রাজারহাটসহ জেলার ৯ উপ‌জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝড়-বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। সামান্য বাতাস শুরু হলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়া যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

দমকা হাওয়ায় গাছ ভেঙে বিদ্যুতের তারের ওপর পড়ে, কোথাও ছিঁড়ে যায় সঞ্চালন লাইন। অনেক এলাকায় ঝড় থেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় গ্রাহকদের। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থাকার ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। জেলার অনেক স্থানে এখনও পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত সংযোগ, ঝুলন্ত তার, দুর্বল খুঁটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সামান্য ঝড়েই ভেঙে পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার বহু পুরোনো সঞ্চালন লাইন এখনও সংস্কার না হওয়ায় দুর্ভোগের শেষ নেই সেখানকার মানুষের।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে বজ্রঝড়, দমকা হাওয়া ও আকস্মিক ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়েছে। বজ্রপাতের কারণে ট্রান্সফরমার ও সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ঝড়ের সময় বড় গাছ উপড়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ গাছ থাকলেও নিয়মিত সেগুলো ছাঁটাই করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর যাত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। এতে দৈনন্দিন কাজকর্মের পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়।’

ফ্রিল্যান্সার নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের কয়েকজন তরুণ বাড়িতে বসে ফ্রিল্যান্সিং করি। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে নিয়মিত সমস্যায় পড়তে হয়। বর্ষা মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে।’

Advertisement

ব্রহ্মপুত্র নদের হকের চর এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও সুফল খুব একটা পাই না। বর্ষা মৌসুমের কথা বাদই দিলাম, শুষ্ক মৌসুমেও নিয়মিত বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। ফলে সৌরবিদ্যুতের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় লাইন সচল থাকলেও দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হয় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের।’

পল্লি বিদ্যুতের একাধিক গ্রাহক বলেন, শুধু সাময়িক মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দুর্যোগ-সহনশীল করতে হবে। এজন্য পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইন পরিবর্তন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রামাঞ্চলে শক্তিশালী খুঁটি স্থাপনের দাবি জানান তারা।

কুড়িগ্রাম রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাবে চলতি মৌসুমে ঘন ঘন হালকা, মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গত বছর এ অঞ্চলে মোট ৭২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। আর চলতি মৌসুমে শুধু মে মাস পর্যন্ত ৬১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।’

কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. শামীম পারভেজ বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বজ্রপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাবে প্রতিবছর জেলায় প্রায় সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশ ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়ে। ট্রান্সফরমারে বজ্রনিরোধক গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টির সময় প্রায়ই গাছ ভেঙে বিদ্যুতের লাইনের ওপর পড়ে তার ছিঁড়ে যায়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক সময় বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখতে হয়।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিশেষ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ কুড়িগ্রামেও বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হবে।’

রোকনুজ্জামান মানু/এএইচ/এএসএম