মতামত

ইরান যুদ্ধে কে হারল, কে জিতল?

অবশেষে ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। সেই মোতাবেক সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনাও হয়ে গেল ২১ জুন। সরাসরি যুদ্ধটা থেমে গেছে। এর পর থেকেই বাচ্চাদের খেলার মতো বিশ্বব্যাপী আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছে—যুদ্ধে কে জিতল আর কে হারল?

Advertisement

মুহুর্মুহু আক্রমণের শিকার হয়ে, অনেক অবকাঠামো ধ্বংসের পরও এই অসম শক্তির যুদ্ধে ইরান যে জিতে গেল, তা নিয়ে হিলারি ক্লিনটন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের কূটনীতিক মালিহা লোধি, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়া জাগানো অধ্যাপক জেফরি স্যাকস থেকে শুরু করে ভারতের যুদ্ধবিশেষজ্ঞ প্রভীন শায়নি—সকলেই ঘোষণা দিয়েছেন, এই যুদ্ধে ইরান জয় লাভ করেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখে চুনকালি পড়েছে। এমনকি ১৭ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৯৩.১ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করে, এই যুদ্ধে ইরান জয় লাভ করেছে।

ইরানের এই জয় যেন বিশ্বকাপ ফুটবলে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র ক্যাবো ভের্দের শক্তিশালী দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং উরুগুয়েকে দাপটের সঙ্গে ঠেকিয়ে দেওয়ার প্রতিরূপ।

কিন্তু কী করে ইরান এই অসম যুদ্ধে জয় পেল, তা একটু বিশ্লেষণের দাবি রাখে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের ধারণা ছিল, এক দিন, দুই দিন, অথবা বড়জোর তিন দিনের মধ্যেই ইরান পরাস্ত হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দম্ভের সঙ্গে সে কথা বারবার বলেছেন। ইরানে নতুন সরকার বসবে, ট্রাম্প সাহেব ঠিক করবেন কে হবেন ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান এবং কে হবেন সরকারপ্রধান। ঠিক ইরাকে যেমন করা হয়েছিল।

Advertisement

এই ধারণার জন্ম হয়েছিল বেশ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, ইরানে সরকারবিরোধী একটি বড় আকারের আন্দোলন চলছিল। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল। অন্যদিকে মোল্লাতান্ত্রিক শাসনে দেশের বড় একটি অংশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল হামলা করলে দেশের অভ্যন্তর থেকেই শাসনক্ষমতা পাল্টে যাবে।

এ ব্যাপারে ইসরায়েলের পরামর্শ ছিল, হামলা হলে শুধু দেশের অভ্যন্তরেই মানুষ জেগে উঠবে না, সেই সঙ্গে ইরানের ইসলামি রিপাবলিকবিরোধী কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে নেমে পড়বে।

এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরে শাসকদের জনপ্রিয়তা অনেকটাই ফিরে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে অপরাজেয় দেশ- এই ধারণাও বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর গভীর প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বাণিজ্যে।

দ্বিতীয়ত, ধারণা ছিল, এমনিতেই গত বছরের ১০ দিনের হামলায় ইরান দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরের হামলায় ইরাকের মতো তিন-চার দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়বে। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল। ৭০-এর দশকের পুরোনো প্রযুক্তি, যার এখন আর কোনো কার্যকারিতা নেই। (এই ধারণাগুলো ছিল মূলত ইসরায়েলের, যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপেছে।)

Advertisement

কিন্তু ইরান যুদ্ধের সম্পূর্ণ নতুন কৌশল দিয়ে সবাইকে থমকে দিয়েছে। প্রায় ২০ বছর ধরে ইরান আকাশ প্রতিরক্ষায় মহামূল্যবান ফাইটার বিমান সংগ্রহ না করে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের মতে, ইরান ৭০ হাজার ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করেছিল, যুদ্ধে যার অর্ধেকেরও কম ব্যবহৃত হয়েছে।

অবশ্য এ ক্ষেত্রে একটি কথা আছে। ইরান ইচ্ছা করলেই নিষেধাজ্ঞার কারণে যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করতে পারত না। সেটাই ইরানের জন্য শাপেবর হয়েছে। যেভাবে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তা হাজার হাজার কোটি টাকার যুদ্ধবিমান দিয়েও সম্ভব হতো না।

এখন বলা হচ্ছে, ইরানের এই যুদ্ধের পর গোটা বিশ্বের সামরিক প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ইরানকে ১০০ দিনেও আত্মসমর্পণ করানো যায়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি ঘাঁটির কোনোটি ইরান ধ্বংস করেছে, আবার কোনোটি অকার্যকর করে দিয়েছে।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান, যার একটি বড় অংশ ইসরায়েলের স্বনামধন্য আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ঠেকানো যায়নি। ইসরায়েলের বহু ক্ষয়ক্ষতির খবর দেশটি বাইরে বের হতে দেয়নি। তারপরও কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম উল্লেখযোগ্য ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রকাশ করেছে।

এ তো গেল যুদ্ধক্ষেত্রের কথা। রাজনৈতিকভাবে কী হয়েছে?

ইরান যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আপসের পথে হাঁটতে হয়েছে। ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করতে গিয়ে ইসরায়েল গোটা ইউরোপের অসন্তোষের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। এটিও ইরানের এক ধরনের জয়।

অর্থনৈতিক জয়ও পেয়েছে ইরান। যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল হরমুজ প্রণালি, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল আমদানি-রপ্তানি হয়। ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়। শত চেষ্টা করে, বোমা হামলা চালিয়ে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রায় সব কটি ক্যারিয়ার মোতায়েন করেও হরমুজ মুক্ত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

সারা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পণ্যমূল্য লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটি বড় চাপ তৈরি করে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ঊর্ধ্বমূল্যের চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা ট্রাম্পের রাজনীতির জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি বড় অংশ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, দীর্ঘ ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়নি, তা ইরান যুদ্ধের কয়েক মাসেই দেশটিকে ভোগ করতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এতকাল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভেবেছে, তাদের নিরাপত্তার পাহারাদার হবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি। কিন্তু তারা দেখতে পেয়েছে, তাদের পাহারা দেওয়া তো দূরের কথা, নিজেদের ঘাঁটিগুলোকেই ইরানের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

তাহলে বড় দুই পরাশক্তি চীন এবং রাশিয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে কীভাবে? তাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। তাদের বোধোদয় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা না ঢেলে তারা আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করেছে। এমনকি সৌদি আরবও।

১৩ জুন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত হামলা না করার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ইরানকে দশ বিলিয়ন ডলার আটকে থাকা অর্থ ফেরত দিতে সম্মত হয়েছে এবং তিন বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই গোপনে পরিশোধ করেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত তা অস্বীকার করেছে, তবে ঘটনাটি সত্য বলে রয়টার্স বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দাবি করেছে।

ইরান ওই চুক্তির পর কাতার, জর্ডান এবং অন্যান্য দেশে হামলা করলেও আমিরাতে আর কোনো হামলা চালায়নি।

এই যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের ধর্মীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র সামরিক ও বেসামরিক নেতা নিহত হয়েছেন। এটি তাদের বড় ক্ষতি। কিন্তু অপরপক্ষে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান টালমাটাল হয়ে গেছে।

নভেম্বরে ট্রাম্পের মিডটার্ম নির্বাচন। সেখানে তাঁর সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী ক্ষোভে ফুঁসছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে দেশটির আদালতে। ক্ষমতা থেকে নামলেই তাঁকে জেলে যেতে হতে পারে। ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুবিরোধীরা আরও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।

অন্যদিকে এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরে শাসকদের জনপ্রিয়তা অনেকটাই ফিরে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে অপরাজেয় দেশ- এই ধারণাও বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর গভীর প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বাণিজ্যে।

এই যুদ্ধে নিজেদের না জড়িয়েও বড় আকারে লাভবান হয়েছে চীন—অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে। সেই প্রসঙ্গ আরেক দিন আলোচনা করা যাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

এইচআর/জেআইএম