খেলাধুলা

চার বছর পরও পর্তুগালে একই বিতর্ক: রোনালদো কেন এখনো একাদশে?

বড় কিছু অর্জনের প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে পর্তুগাল। তবে দলটিকে ঘিরে একটি বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপের মধ্যে সময়ের ব্যবধান চার বছর হলেও পর্তুগালের বাস্তবতায় খুব একটা পরিবর্তন আসেনি।

Advertisement

বুধবার কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ে ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স আবারও সেই পুরোনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে—বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার কি এখনো বড় টুর্নামেন্টে শুরুর একাদশে খেলার যোগ্য?

এটি অবশ্য নতুন কোনো প্রশ্ন নয়। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজকে এখন যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তার পূর্বসূরি ফার্নান্দো সান্তোস। শেষ পর্যন্ত সান্তোস গ্রুপ পর্বের পর রোনালদোকে একাদশ থেকে বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু মার্টিনেজ এখনো তার ওপর আস্থা রাখছেন।

অনেক পর্তুগিজ সমর্থকের কাছেই এটি রহস্যময়। ২০২২ বিশ্বকাপকে রোনালদোর বিশ্বমঞ্চে শেষ অধ্যায় বলেই মনে করা হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল ৩৭, আর মাঠে তাকে আগের মতো ছন্দে দেখা যাচ্ছিল না। সুইজারল্যান্ড ও মরক্কোর বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তাকে বেঞ্চে বসানো অবশ্য বিস্ময়কর ছিল, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে স্পষ্ট যুক্তি ছিল।

Advertisement

কাতার বিশ্বকাপের পর সান্তোসের জায়গায় দায়িত্ব নেন মার্টিনেজ। একই সময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে তিক্ত বিচ্ছেদের পর ইউরোপের শীর্ষ লিগ ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে যোগ দেন রোনালদো। অনেকের কাছেই সেটি ছিল পর্তুগাল দলের নতুন যুগের সূচনা—যেখানে রোনালদো আর দলের মুখপাত্র হবেন না। কিন্তু প্রত্যাশিত সেই পালাবদল আর ঘটেনি।

রোনালদোর পক্ষ থেকেও কোনো আবেগঘন বিদায়ের ঘোষণা আসেনি। সান্তোসের মতো মার্টিনেজও নিয়মিত তাকে দলে ডাকতে থাকেন। ফলে চার বছর আগে যেটিকে অনেকে রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ভেবেছিলেন, সেই একই বিতর্ক আবারও ফিরে এসেছে।

বরং মনে হচ্ছে, ২০২২ সালে সান্তোসের চেয়েও মার্টিনেজ বেশি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে রোনালদো এখনো এই পর্যায়ে শুরুর একাদশে খেলার সামর্থ্য রাখেন। কাতার বিশ্বকাপের আগে সান্তোস ও তার কোচিং স্টাফ এমনকি কিছু ম্যাচে রোনালদোকে ‘প্রভাবশালী বদলি’ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাও আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু মার্টিনেজের ক্ষেত্রে অন্তত বাইরে থেকে তেমন কোনো ভাবনা দেখা যায় না। বরং এ নিয়ে বারবার প্রশ্ন শুনে তিনি বিরক্তও হয়ে উঠছেন।

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম ভদ্র ও হাস্যোজ্জ্বল কোচ হিসেবে পরিচিত মার্টিনেজ। তবে রোনালদো নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে তার সেই স্বভাবসুলভ হাসি অনেক সময় ম্লান হয়ে যায়। ইউরো ২০২৪-এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে রোনালদোর একাদশে থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘গত মৌসুমে আল নাসরের হয়ে ক্রিস্টিয়ানো কত মিনিট খেলেছে, জানেন?’ সাংবাদিক উত্তর দেন, ‘উনি তো সব ম্যাচেই শুরু থেকে খেলেছেন।’

Advertisement

জবাবে মার্টিনেজ হালকা হাসি দিয়ে বলেন, ‘আপনি নিজেই আপনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলেছেন।’ মার্টিনেজ জানেন, সংবাদমাধ্যমের সামনে বসলেই তাকে রোনালদো প্রসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে তিনি প্রায়ই পরিসংখ্যানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে শেষ ৩০ ম্যাচে ২৫ গোল করা একজন খেলোয়াড়কে দলে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।’

২০২৪-২৫ নেশনস লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন রোনালদো, যে টুর্নামেন্টটি জিতেছিল পর্তুগাল। জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনাল এবং স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেও গোল করেছিলেন তিনি। ক্লাব ফুটবলেও তার পরিসংখ্যান চমৎকার। গত মৌসুমে আল নাসরের হয়ে ৩৭ ম্যাচে ৩০ গোল করেছেন, তার আগের মৌসুমে ৪১ ম্যাচে করেছিলেন ৩৫ গোল।

তবে সমালোচকদের মতে, সৌদি প্রো লিগের মান ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর তুলনায় অনেক নিচে। তাই এই পরিসংখ্যানের মূল্যায়নেও তারা সংযত। এছাড়া ২০২১ সালের জুনের পর থেকে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ওপেন প্লে থেকে গোলও করতে পারেননি রোনালদো।

তবে মার্টিনেজের কাছে পরিসংখ্যানই শেষ কথা। কঙ্গোর বিপক্ষে তাকে এতক্ষণ মাঠে রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি আবারও রোনালদোর গোলসংখ্যার প্রসঙ্গ টানেন। ‘যে ম্যাচে আপনার গোল দরকার, সেখানে বিশ্বের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না,’ বলেন তিনি। পর্তুগালের অনেক সমর্থকের কাছে রোনালদো প্রায় সমালোচনার ঊর্ধ্বে। আবার অন্যরা মার্টিনেজের অবস্থানে এতটাই বিস্মিত যে, কেউ কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করেন বিশ্বকাপের পর আল নাসরের দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তিনি রোনালদোকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন।

কঙ্গো ডিআরের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদোর বলে টাচ ছিল মাত্র ২৯ বার। তিনটি শট নিয়েছিলেন, কিন্তু একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। ম্যাচের এক পর্যায়ে সতীর্থ ব্রুনো ফার্নান্দেস ভালো অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও নিজে শট নেওয়ার চেষ্টা করায় ম্যাচ শেষে সাবেক আর্সেনাল তারকা থিয়েরি অঁরি রোনালদোর সমালোচনা করেন।

অঁরি বলেন, ‘দলের গোল প্রয়োজন, আপনার ব্যক্তিগত গোল নয়।’ অর্থাৎ তার ইঙ্গিত ছিল, রোনালদো যেন পর্তুগালের চেয়ে নিজের গোলের দিকেই বেশি মনোযোগী। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর সাবেক সতীর্থ পল স্কোলস ছিলেন আরও কঠোর। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, ৪১ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের মাঠে শুরুর একাদশে থাকার একটাই জায়গা আছে। সেটা হলো গোলকিপারের পজিশন।’

সমস্যা হলো, বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড নিয়ে শিরোপার দাবিদার হিসেবে বিবেচিত পর্তুগালের জন্য এই রোনালদো বিতর্কটি বড় বিভ্রান্তিতে পরিণত হতে পারে। যদিও দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই বিষয়টিতে অভ্যস্ত। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য দলকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন মার্টিনেজ।

পর্তুগালের ফুল-ব্যাক দিয়োগো দালোত শনিবার বলেছিলেন, ‘এমন একটি দলে, বিশেষ করে যখন ক্রিস্টিয়ানোর মতো একজন খেলোয়াড় থাকে, তখন আমাদের স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি প্রস্তুত থাকতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বকাপের আগে আমরা এ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম বলেই এমন পরিস্থিতি আসার পর সবাইকে জানাতে পেরেছি যে আমাদের দল অটুট। আমরা জানতাম এটা ঘটবে। ইতিবাচক দিক হলো, সমস্যাটা শুরুতেই এসেছে। যত দ্রুত বাধা আসে, তত দ্রুত সেটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া যায়।’

তবে বাস্তবতা হলো, রোনালদো গোল করা শুরু না করা পর্যন্ত কিংবা অন্তত স্পষ্টভাবে প্রমাণ না করা পর্যন্ত যে তিনি এই প্রতিভাবান দলের জন্য সহায়ক, বাধা নন—এই বিতর্ক থামবে না।

মঙ্গলবার হিউস্টনে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামবে পর্তুগাল। বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ গোলশূন্য থাকার ধারাও ভাঙতে চাইবেন রোনালদো। যদি আবারও ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে শুরুর একাদশে রাখার বিতর্ক আরও জোরালো হবে।

আরএএইচইউএল/এসকেডি/জেআইএম