অর্থনীতি

রূপান্তরিত মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কমায় আতঙ্ক, বাস্তবে কী ঘটেছে?

পোর্টফোলিওতে হঠাৎ ইউনিট সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ডের অনেক বিনিয়োগকারী। তাদেরই একজন রাসেল আহমেদ। ২০২৫ সালে তিনি ফান্ডটির ৩০ হাজার ইউনিট কিনেছিলেন। সম্প্রতি নিজের পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখেন, তার হিসাবে রয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ ইউনিট। অর্থাৎ, ৬৯৯ ইউনিট গায়েব বা কমে গেছে।

Advertisement

গত বছরের অক্টোবরে ফান্ডটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় শেয়ারবাজারে এর লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কোনো লেনদেন না হওয়া সত্ত্বেও ইউনিট সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি দেখে বিস্মিত হন রাসেল আহমেদ।

এই বিনিয়োগকারী জাগো নিউজকে বলেন, ১৮ জুন ব্রোকারেজ হাউস থেকে পাঠানো পোর্টফোলিওতে দেখি আমার হিসাবে এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ডের ২৯ হাজার ৩০১ ইউনিট রয়েছে। অথচ আমি কিনেছিলাম ৩০ হাজার ইউনিট। লেনদেন বন্ধ থাকার মধ্যে ইউনিট কমার কারণ জানতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কেউ পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলতে পারেনি। এতে আমার মতো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

রাসেলের মতো একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন ফান্ডটির অন্য ইউনিটধারীরাও। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউনিট সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে কোনো কারসাজি বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির বিষয় নেই। বরং মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) ফান্ডটিকে বে-মেয়াদি (ওপেন-এন্ড) ফান্ডে রূপান্তরের ফলে বিধিমালা অনুযায়ী ইউনিট পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

Advertisement

সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ডকে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তরের অনুমোদন দেয়। এ প্রক্রিয়ায় ইউনিটধারীদের নতুন ইউনিট বরাদ্দ করা হয়েছে ফান্ডের নিট সম্পদমূল্য (নেট অ্যাসেট ভ্যালু বা এনএভি) অনুযায়ী।

আরও পড়ুন আইপিওতে কমছে সাধারণের অংশ, বাড়ছে প্রবাসী-মিউচুয়াল ফান্ডের কোটা

মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ক্লোজড-এন্ড ফান্ড ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তরিত হলে ইউনিটধারীরা ফান্ডের প্রকৃত সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে ইউনিট পান। নতুন ইউনিটের ফেস ভ্যালু ধরা হয় ১০ টাকা। ফলে রূপান্তরের সময় এনএভি যদি ১০ টাকার কম থাকে, তাহলে ইউনিট সংখ্যা কমে যায়। আর ১০ টাকার বেশি হলে ইউনিট সংখ্যা বেড়ে যায়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের মূল্য অপরিবর্তিত থাকে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বিনিয়োগকারীর কাছে যদি ১০০ ইউনিট থাকে এবং রূপান্তরের সময় ইউনিটপ্রতি এনএভি হয় ৯ টাকা, তাহলে তার মোট সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় ৯০০ টাকা। এ অবস্থায় তাকে ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর ৯০ ইউনিট দেওয়া হবে। আবার এনএভি ১১ টাকা হলে তিনি পাবেন ১১০ ইউনিট। অর্থাৎ, ইউনিটের সংখ্যা বদলালেও সম্পদের মোট মূল্য একই থাকবে।

তবে এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ডটির সর্বশেষ প্রকাশিত এনএভি ১০ টাকা ৭ পয়সা হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বাজারে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মহলে দাবি উঠেছে, এনএভি ১০ টাকার বেশি থাকার পরও বিনিয়োগকারীদের কম ইউনিট দেওয়া হয়েছে। এর জেরে বাজারে বিভিন্ন গুজব ছড়ানো হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে দরপতনও দেখা গেছে।

Advertisement

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানেই মূল ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, ইউনিট রূপান্তরের হিসাব করা হয়েছে সর্বশেষ প্রকাশিত এনএভির ভিত্তিতে নয়, বরং বিএসইসি অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট কাট-অফ তারিখের এনএভির ভিত্তিতে।

রূপান্তরের পর ইউনিটধারী চাইলে ওপেন-এন্ড ফান্ডের ইউনিট সারেন্ডার করে তার প্রাপ্য অর্থ তুলে নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তিনি তখনকার ঘোষিত এনএভি অনুযায়ী অর্থ পাবেন। ফলে রূপান্তরের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।—মো. আবুল কালাম

জানা গেছে, রূপান্তরের জন্য নির্ধারিত সময়ে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি এনএভি ছিল ৯ টাকা ৭৭ পয়সা। সেই এনএভি অনুযায়ীই ইউনিট রেশিও নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ইউনিটধারীরা আগের তুলনায় কিছু কম ইউনিট পেয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, কোনো ক্লোজড-এন্ড (মেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ড ওপেন-এন্ড (বে-মেয়াদি) ফান্ডে রূপান্তরিত হলে ইউনিটধারীরা তাদের ইউনিটের বিপরীতে ফান্ডের প্রকৃত নিট সম্পদমূল্য (নেট অ্যাসেট ভ্যালু বা এনএভি) অনুযায়ী ইউনিট পাবেন। অর্থাৎ, রূপান্তরের ক্ষেত্রে কোনো বিনিয়োগকারী লাভ বা ক্ষতির মুখে পড়বেন না, তিনি ফান্ডের সম্পদের প্রকৃত মূল্যই পাবেন।

আরও পড়ুন মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না, বিএসইসির নতুন বিধিমালা

তিনি বলেন, যদি কোনো ফান্ডের প্রতি ইউনিটের এনএভি ১৫ টাকা হয় এবং ফেস ভ্যালু ১০ টাকা ধরা হয়, তাহলে একজন ইউনিটধারী একটি ইউনিটের বিপরীতে ১ দশমিক ৫ ইউনিট পাবেন। আবার এনএভি ৯ টাকা হলে তিনি একটি ইউনিটের বিপরীতে শূন্য দশমিক ৯ ইউনিট পাবেন। অর্থাৎ, ইউনিটের সংখ্যা নির্ধারিত হবে এনএভির ভিত্তিতে, আর ইউনিট ইস্যু হবে ১০ টাকা ফেস ভ্যালু ধরে।

তার ভাষ্য, রূপান্তরের পর ইউনিটধারী চাইলে ওপেন-এন্ড ফান্ডের ইউনিট সারেন্ডার করে তার প্রাপ্য অর্থ তুলে নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তিনি তখনকার ঘোষিত এনএভি অনুযায়ী অর্থ পাবেন। ফলে রূপান্তরের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বিএসইসির এ মুখপাত্র আরও বলেন, বাস্তবে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর এবং ফান্ড লিকুইডেশনের উদ্দেশ্য একই—বিনিয়োগকারীদের তাদের সম্পদের মূল্য ফিরিয়ে দেওয়া। তবে লিকুইডেশনের ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত সম্পদ (আন্ডারলাইং অ্যাসেট) বিক্রি করতে গিয়ে অনেক সময় ঘোষিত এনএভির চেয়ে কম মূল্য পাওয়া যেতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা কম অর্থ পেতে পারেন। অন্যদিকে, ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। এ কারণেই অনেক ক্ষেত্রে রূপান্তরকে লিকুইডেশনের চেয়ে ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কর সুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিএসইসির এ মুখপাত্র। তিনি বলেন, কোনো ফান্ডের এনএভি যদি ফেস ভ্যালুর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সরাসরি লিকুইডেশনের ক্ষেত্রে মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইন) সংশ্লিষ্ট করের বিষয় আসতে পারে। কিন্তু রূপান্তরের সময় ইউনিটধারীরা এনএভির ভিত্তিতে অতিরিক্ত ইউনিট পেলেও তা ফেস ভ্যালুতেই ইস্যু করা হয়। ফলে এ পর্যায়ে সাধারণত কোনো মূলধনী মুনাফা গণ্য হয় না এবং করের দায়ও সৃষ্টি হয় না। এদিক থেকেও রূপান্তর বিনিয়োগকারীদের জন্য অধিক সুবিধাজনক।

রূপান্তরের পর ইউনিটধারীরা কতদিনের মধ্যে ইউনিট সারেন্ডার করতে পারবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মো. আবুল কালাম বলেন, নতুন অ্যাসেট ম্যানেজার দায়িত্বগ্রহণ করে এনএভি ঘোষণা করার পর থেকেই ইউনিটধারীরা ইউনিট সারেন্ডার করতে পারবেন। আর ইউনিট সারেন্ডারের পর প্রচলিত নিষ্পত্তি (সেটেলমেন্ট) নিয়ম অনুযায়ী টি+২ সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, সাধারণত দুই কার্যদিবসের মধ্যেই বিনিয়োগকারী তার অর্থ পেয়ে যাবেন।

বিষয়টি নিয়ে এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক, স্ট্র্যাটেজিক ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এহসানুল কবিরও একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। বাস্তবে ইউনিট সংখ্যা কমে গেলেও বিনিয়োগকারীদের মোট সম্পদের মূল্য কমছে না।

বোনাস শেয়ার দেওয়া হলে শেয়ারের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু প্রতি শেয়ারের দাম কমে যায়। এখানে ঠিক তার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। ইউনিট সংখ্যা কমেছে, কিন্তু প্রতি ইউনিটের মূল্য বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের মূল্য একই থাকবে।—এহসানুল কবির

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, রূপান্তরের সময় ইউনিট রেশিও নির্ধারণ করা হয়েছে বিএসইসির অনুমোদনপত্র ও নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত একটি কাট-অফ তারিখের নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি)-এর ভিত্তিতে। এটি ফান্ডের সর্বশেষ প্রকাশিত এনএভি নয়। ফলে বর্তমানে ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত সর্বশেষ এনএভি ১০ টাকা ৭ পয়সা হলেও রূপান্তরের হিসাব সেই এনএভির ভিত্তিতে করা হয়নি।

আরও পড়ুন মিউচুয়াল ফান্ডের নতুন বিধিমালা / থাকবে না মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড, প্রতিদিন প্রকাশ করতে হবে এনএভি

তিনি বলেন, কনভার্সনের রেশিও নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের অক্টোবরের একটি নির্দিষ্ট তারিখের এনএভি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিএসইসির নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে। সেই সময় ফান্ডের এনএভি ১০ টাকার নিচে থাকায় ইউনিট রূপান্তরের পর আগের তুলনায় কম সংখ্যক ইউনিট বরাদ্দ হয়েছে।

‘ইউনিট সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ বিনিয়োগকারীর ক্ষতি নয়। কারণ, ইউনিট সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি ইউনিটের এনএভি বা মূল্য অনুপাতে বেড়ে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীর মোট বিনিয়োগমূল্য অপরিবর্তিত থাকে।’

বিষয়টি বোঝাতে তিনি বোনাস শেয়ারের উদাহরণ দেন। এহসানুল কবির বলেন, বোনাস শেয়ার দেওয়া হলে শেয়ারের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু প্রতি শেয়ারের দাম কমে যায়। এখানে ঠিক তার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। ইউনিট সংখ্যা কমেছে, কিন্তু প্রতি ইউনিটের মূল্য বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের মূল্য একই থাকবে।

এনএভি প্রতিদিনই বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তাই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত এনএভির মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। ডিএসইতে প্রকাশিত সর্বশেষ এনএভি এবং রূপান্তরের জন্য ব্যবহৃত এনএভি দুটিই সঠিক, তবে সেগুলো ভিন্ন সময়ের হিসাব। ফান্ড রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি বিএসইসির নির্দেশনা ও অনুমোদনপত্র অনুসারেই সম্পন্ন হয়েছে এবং ইউনিট রেশিও নির্ধারণেও সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছে—যোগ করেন এহসানুল কবির। 

এমএএস/এমকেআর