মতামত

নদী আমাদের জীবন, লাশ গুমের নিরাপদ ঠিকানা হতে পারে না

ধরে নেই একরত্তি মেয়েটার নাম কদমফুল। কারণ একটা কদম ফুল পাওয়ার জন্যই ওকে নির্মমভাবে মারা যেতে হলো। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটি এলাকার চার তরুণের সাথে কংস নদের পাড়ে জঙ্গলে গিয়েছিল কদম ফুল পাড়বে বলে। তবে সেই ফুল তার আর পাড়া হয়নি, বরং চার পাষণ্ড তাকে ধর্ষণ করে। পাঁচ বছরের শিশুটির পক্ষে এই পাশবিক অত্যাচার সহ্য করা সম্ভব হয়নি।

Advertisement

সে অচেতন হয়ে পড়েছিল। তার ছোট্ট দেহটি যেন কেউ খুঁজে না পায়, সেজন্য অভিযুক্তরা অচেতন অবস্থায় তাকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে এবং পরে কাদার মধ্যে পুঁতে রাখে। যেন কংস নদে তার দেহটি ভেসে না ওঠে। শুধু ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনাই নয়, পানিতে চুবিয়ে হত্যা এবং হত্যার পরে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী যেন লাশ গুমের নিরাপদ ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ বছরে (২০২১-২০২৫) নৌপুলিশ দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে খুনের ঘটনা বেশি। নৌপুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০২৫) দেশের নদ-নদী থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৪৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। গত বছরও এই সংখ্যা ছিল মাসে গড়ে ৩৭ জন।

উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশেরই কোনো পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। দেশে বিভিন্ন কারণে হত্যা বাড়ছে এবং প্রয়োজন পড়ছে লাশ লুকানোর নিরাপদ জায়গা, নদীই এখন সেই নিরাপদ জায়গা। অথচ বাংলার নদী এদেশের সৌন্দর্য, গর্ব। এই নদীর মাছ খেয়েই দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ হয়। এই নদী কেন মৃত মানুষের ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হলো? সারা দেশেই নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা কেন বাড়ছে? কেন অপরাধীরা নদীগুলো সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে? অপরাধীরা মূলত হত্যার পর প্রমাণ লোপাট ও আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য মরদেহ পানিতে ফেলে দিতে নদী বেছে নিচ্ছে।

Advertisement

বলা যায় খুনের পর লাশ গুম করার জন্যই তারা এই সহজ উপায় বেছে নিচ্ছে। নৌপুলিশ বলেছে, নদী থেকে উদ্ধার মরদেহ শনাক্ত করতে প্রায়ই পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। এটি একটি নিয়মিত চ্যালেঞ্জ। গত পাঁচ বছরে উদ্ধার করা লাশের মধ্যে, ১ হাজার ৪২৫ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হলেও বাকি ৬৩৯ জনের মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি। এই শনাক্ত যেন না করা যায়, তাই লাশ গুমের এই সহজ উপায় বের করা হয়েছে। পুলিশ ও অপরাধতত্ত¡ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত গ্রেফতার এড়াতে অপরাধীরা মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়।

উদ্ধার হওয়া লাশের অধিকাংশই হত্যাকাণ্ড। অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে ও গ্রেফতার এড়াতে গুমের জন্য লাশ নদীতে ফেলছে খুনিরা। পানির স্রোতে লাশ ভেসে চলে যায় বলে নদীকে লাশ গুমের ‘নিরাপদ স্থান’ মনে করে অপরাধীরা। অনেক ঘটনায় নদীতে মরদেহ ভেসে ওঠার আগেই তাতে পচন ধরে আঙুলের ছাপ মুছে যায় এবং চেহারা বিকৃত হওয়ায় অনেক লাশের পরিচয় জানা যায় না। মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড প্রমাণ হলেও হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা যায় না। আবার লাশ শনাক্ত হলেও, লাশ পচন ধরে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ জানা যায় না। হত্যার প্রমাণ গায়েবের সহজ উপায় নদী, শাখা নদী এবং আরও অনেক জলাশয়।

অপরাধী যেন নদীকে ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য ভৌগোলিক ম্যাপ তৈরি করা বা হটস্পট ম্যাপিং করা যেতে পারে। যেমন কোন কোন জেলায়, কোন কোন নদীতে বা সেতুতে সবচেয়ে বেশি লাশ ফেলা হয়, এটা দেখা। নদী আমাদের জীবন, অপরাধের ডাম্পিং গ্রাউন্ড নয়। কাজেই নদীতে লাশ ফেলে অপরাধ আড়াল করা রোধ করতেই হবে। এজন্য আইনি, প্রযুক্তিগত এবং সামাজিক নজরদারি বাড়ানো খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও থেকে মরদেহ উদ্ধারের খবর আসছে। দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে প্রতিদিন গড়ে উদ্ধার হচ্ছে একটির বেশি লাশ। ”অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করতে ও আইনের চোখ ফাঁকি দিতে হত্যার পর মরদেহ ফেলার জন্য নদী ও রেলপথ বেছে নেয়। মূলত সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে এ রকম ঘটে। অপরাধীরা হত্যার আগেই নির্ধারণ করে নদী এলাকার কোথায় মরদেহ ফেলা হবে” (অধ্যাপক ওমর ফারুক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ)। তবে সব যে হত্যাকাণ্ড, তা নয়। এরমধ্যে আছে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা, মাছ ধরতে, ঘুরতে এবং গোসল করতে গিয়ে মৃত্যু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং নৌদুর্ঘটনা।

Advertisement

দেশে অপরাধ যত বাড়বে, অপরাধীরা তত বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে তাদের কাজের প্রমাণ লোপাট করার জন্য। যেমন দেশে ধর্ষণের ঘটনা যত বাড়ছে, অপরাধীরা ততই চাইছে ভিকটিমকে হত্যা করতে। গত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫৮০টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে ৪৮৩ জনকে। সূত্র: হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। হত্যা করলে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় এবং মূল ভিকটিমের সাক্ষ্য পাওয়া যায় না।

সেইসাথে অনেক পরে লাশের সন্ধান পেলেও লাশের পরিচয় প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে দেশে রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে খুন, টার্গেট কিলিং ও বন্দুক হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মানুষ হত্যা বেড়েছে, বেড়েছে টুকরা মরদেহ বস্তাবন্দি করে পানিতে ফেলা, পুড়িয়ে দেওয়া ও মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে চারদিকে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই পরিস্থিতিতে লাশ লোপাট করার দিকে অপরাধীরা ঝুঁকছে বেশি। এই কাজে সবচেয়ে নারকীয় কিন্তু সহজ উপায় হলো মরদেহ টুকরা করে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া। ”ভাড়াটে খুনি দিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে রাতের আঁধারে লাশ গোপন করতে নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। নদীসংলগ্ন এলাকায় লোকজনের চলাচল কম থাকার সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে খুনিরা। যেসব স্থান দিয়ে নদীতে লাশ ফেলা হচ্ছে, তা ঠেকাতে সেসব স্থান চিহ্নিত করে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে” (মো. রেজাউল করিম সোহাগ, চেয়ারপারসন, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।

দেশের অনেক বড় এলাকা নদী বিধৌত, কিন্তু এখন সময় এসেছে অপরাধ ঠেকানোর জন্য সেইসব এলাকায় প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধি করা। নদীর ঘাট, সেতু এবং নির্জন তীরবর্তী এলাকায় সিসিটিভি, নাইট-ভিশন সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো যেতে পারে। গভীর রাতে নদীর সন্দেহভাজন পয়েন্টগুলোতে পুলিশের টহল জোরদার করা উচিত।

নদীর ঘাট ও সংলগ্ন অন্ধকার এলাকাগুলোতে শক্তিশালী ফ্লাডলাইটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেই সাথে নদী তীরের মানুষ, মাঝি, কুলি ও স্থানীয় জেলেদের অপরাধের বিষয়ে সতর্ক করা এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশকে জানাতে বলার বিষয়টি বোঝাতে হবে। অপরাধী যেন নদীকে যেন ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে না পাওে, সেজন্য ভৌগোলিক ম্যাপ তৈরি করা বা হটস্পট ম্যাপিং করা যেতে পারে।

যেমন কোন কোন জেলায়, কোন কোন নদীতে বা সেতুতে সবচেয়ে বেশি লাশ ফেলা হয়, এটা দেখা। নদী আমাদের জীবন, অপরাধের ডাম্পিং গ্রাউন্ড নয়। কাজেই নদীতে লাশ ফেলে অপরাধ আড়াল করা রোধ করতেই হবে। এজন্য আইনি, প্রযুক্তিগত এবং সামাজিক নজরদারি বৃদ্ধি করা খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২৩ জুন, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএফএ/এমএস