মতামত

বেসুরো গান, ভাইরাল খ্যাতি এবং এক শিক্ষকের শাস্তি

গান মানুষের প্রাচীনতম সাংস্কৃতিক ভাষাগুলোর একটি। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ আনন্দ, বেদনা, প্রতিবাদ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা কিংবা সামাজিক বার্তা প্রকাশের জন্য গানকে বেছে নিয়েছে। যে সমাজে গান নিষিদ্ধ হয়, সেখানে সাধারণত শুধু একটি শিল্পমাধ্যম নয়, চিন্তার স্বাধীনতারও সংকোচন ঘটে। কিন্তু যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গান গাওয়ার কারণে প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হন, তখন প্রশ্নটি আর কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরিণত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক বিতর্কে।

Advertisement

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে ভাইরাল হওয়া এই শিক্ষককে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার বিষয়ও। তিনি শাহ আব্দুল করিম, জেমস ও ফজলুর রহমান বাবুর জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই দুটি প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রথমত, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কি গান গাইতে পারেন না? দ্বিতীয়ত, কোনো শিক্ষকের শিল্পচর্চা যদি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান কি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে?

প্রশ্ন দুটি সহজ মনে হলেও এর উত্তর মোটেও সরল নয়।

Advertisement

যারা অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিবের বিরুদ্ধে গৃহীত সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন, তাদের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিও। তার আচরণ, বক্তব্য এবং জনসমক্ষে উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও একাডেমিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদি কোনো শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে বা শিক্ষকের পেশাগত পরিচয়কে গৌণ করে দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান বিষয়টি বিবেচনায় আনতেই পারে।

এই পক্ষের আরেকটি যুক্তি হলো, একজন শিক্ষককে তার একাডেমিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়। যদি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা শিক্ষাদান, গবেষণা বা বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিনোদন মঞ্চ নয়; এটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। ফলে শিক্ষকের কার্যকলাপের মূল্যায়নে পেশাগত মানদণ্ড বিবেচনায় আসা স্বাভাবিক।

বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভোগ করলেও প্রতিষ্ঠানবিরোধী আচরণ, হয়রানি, ঘৃণামূলক বক্তব্য বা পেশাগত দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির আছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—গান গাওয়া কি এসব অপরাধের কোনো একটি?

গান গাওয়া অপরাধ নয়। তবে কোনো শিল্পচর্চার আড়ালে যদি পেশাগত দায়িত্বহীনতা, নীতিমালা লঙ্ঘন বা অসদাচরণ থাকে, সেটি অবশ্যই বিচারযোগ্য। কিন্তু বিচার হওয়া উচিত কাজের, শিল্পের নয়; দায়িত্বহীনতার, প্রতিভার নয়।

Advertisement

তবে এই বিতর্কের আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষের মধ্যে ‘ভাইরাল’ হওয়ার এক ধরনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। খ্যাতি এখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিভার চেয়ে দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিবের গান গাওয়ার প্রেরণা কি নিছক শিল্পচর্চার, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত পরিচিতি লাভের আকাঙ্ক্ষাও এর পেছনে কাজ করেছে? অনেক সমালোচকের মতে, তার গাওয়া গানগুলো সংগীতের প্রচলিত মানদণ্ডে খুব একটা পরিশীলিত ছিল না; বরং সুর ও কণ্ঠের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের কাছে তা হাস্যরসের উপাদান হয়ে উঠেছিল।

সামাজিক মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ গানগুলোর শিল্পগুণের জন্য নয়, বরং কৌতুক বা ব্যতিক্রমী বিনোদনের উৎস হিসেবে সেগুলো শেয়ার করেছেন। কিন্তু এখানেও একটি নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। কোনো শিল্পকর্মকে কেউ ভালো বলবেন, কেউ খারাপ বলবেন; কেউ প্রশংসা করবেন, কেউ বিদ্রূপ করবেন—এটাই স্বাভাবিক। শিল্পের মান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু কোনো শিল্পচর্চার মান নিয়ে সমালোচনা এবং সেই শিল্পচর্চার কারণে প্রশাসনিক শাস্তি—দুই বিষয়কে এক করে ফেলা বিপজ্জনক। কারণ বেসুরো গান গাওয়া রুচির প্রশ্ন হতে পারে, কিন্তু তা নিজেই কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।

যারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন, তাদের যুক্তি আরও শক্তিশালী এবং নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছেন, গান গাওয়া কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি শিল্পচর্চা। একজন শিক্ষকও একজন নাগরিক, একজন মানুষ এবং একজন সংস্কৃতিকর্মী হতে পারেন। তার পেশাগত পরিচয় তাকে শিল্পচর্চা থেকে বঞ্চিত করে না।

বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি মুক্তবুদ্ধি ও সৃজনশীলতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একজন শিক্ষক গান গাইবেন, কবিতা লিখবেন, নাটক করবেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করবেন—এটাই তো স্বাভাবিক। একজন শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ নন।

ইতিহাসে এমন বহু শিক্ষাবিদ আছেন, যাঁরা একই সঙ্গে শিল্পী, সাহিত্যিক কিংবা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমন্বিত দর্শনের কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সৃজনশীলতা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা অসম্পূর্ণ। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজও সংগীত, সাহিত্য, নাটক ও শিল্পচর্চাকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যদি অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু কেবল গান গাওয়া বা ভাইরাল হওয়া হয়, তাহলে এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা বিচারক—সবাই ব্যক্তিগত পরিসরে নিজের আগ্রহ ও প্রতিভা প্রকাশ করতে পারেন। জনপ্রিয়তা অর্জন নিজেই কোনো অপরাধ নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় পেশাগত পরিচয়কে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে দেখা হয়। আমরা মনে করি শিক্ষক মানেই গম্ভীর, নির্লিপ্ত এবং নির্দিষ্ট ছাঁচে আবদ্ধ একজন মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন ভালো শিক্ষক একই সঙ্গে একজন গায়ক, লেখক, চিত্রশিল্পী কিংবা ক্রীড়াবিদও হতে পারেন। বরং বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

তবে এই বিতর্কে আবেগের পরিবর্তে নীতির ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া জরুরি। প্রশ্নটি হওয়া উচিত—অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব কি তার একাডেমিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন? তার বিরুদ্ধে কি কোনো সুনির্দিষ্ট পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ আছে? তিনি কি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু যদি মূল অভিযোগ তার গান গাওয়া বা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা হয়, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষার যুক্তিও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কারণ ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ একটি অত্যন্ত আপেক্ষিক ও বিস্তৃত ধারণা। এর অপব্যবহার হলে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সৃজনশীল প্রকাশের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত; মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত করা নয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমনিতেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গবেষণার সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা, মেধা পাচার এবং শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে শিল্পচর্চা সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে ভিন্নতা গ্রহণ করা হবে, সৃজনশীলতাকে উৎসাহ দেওয়া হবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্মানিত হবে।

অবশ্যই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় যে কেউ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার বক্তব্য ও আচরণের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকবেন—এটি প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড হতে হবে সুস্পষ্ট, লিখিত এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কোনো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিবের ঘটনাটি তাই একজন ব্যক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র সম্পর্কে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে শিক্ষকরা কেবল পাঠ্যসূচির ভেতর সীমাবদ্ধ থাকবেন? নাকি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা একসঙ্গে বিকশিত হবে?

গান গাওয়া অপরাধ নয়। তবে কোনো শিল্পচর্চার আড়ালে যদি পেশাগত দায়িত্বহীনতা, নীতিমালা লঙ্ঘন বা অসদাচরণ থাকে, সেটি অবশ্যই বিচারযোগ্য। কিন্তু বিচার হওয়া উচিত কাজের, শিল্পের নয়; দায়িত্বহীনতার, প্রতিভার নয়।

একটি সমাজ তখনই পরিণত হয়, যখন সে ভিন্নতাকে ভয় না পেয়ে তাকে ধারণ করতে শেখে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি মুক্তচিন্তার দুর্গ হয়, তাহলে সেখানে গান, কবিতা, শিল্প ও জ্ঞান—সবকিছুরই জায়গা থাকবে। কারণ যে সমাজ গানের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সে সমাজ একসময় চিন্তার স্বাধীনতাকেও সংকুচিত করতে শুরু করে। আর চিন্তার স্বাধীনতা হারালে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভবন হয়ে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয় আর থাকে না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/এমএস