বয়সটাকে সংখ্যায় আটকে রাখার প্রয়াস তো সবারই থাকে। তবে লিওনেল মেসির বয়সটা সম্ভবত নিজেই সংখ্যায় আটকে থাকতে চায়। নইলে আজই ৩৯ বছরে পা রাখা আর্জেন্টাইন লোকটার পারফরম্যান্সে ক্লান্তির ছাপ কেন নেই? বয়সও নিঃসন্দেহে উপভোগ করে মেসিকে। তাই তো বাড়লেও সেটি সংখ্যার বাইরে কিছুই না। প্রতিনিয়ত মেসি নিজেকে চেনাচ্ছেন তরুণ হিসেবে।
Advertisement
খেলোয়াড়ি জীবনে যে বয়সটা একজন খেলোয়াড়কে বুড়োদের খাতায় ফেলে দেয়, সে বয়সে তার মাঝমাঠ থেকে দৌঁড়ে গোল করা, বক্সের বাইরে থেকে গোলরক্ষককে হতবাক করা বা পাঁচজনের প্রাচীরও ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসা; সবই স্বাভাবিক দৃশ্য। উল্টো তাকে বাধা দিতে আসা প্রতিপক্ষের সদস্যরাই বনে যাচ্ছেন বোকা। তরুণ থেকে বুড়ো সব বয়সেই মেসি বিস্ময়ের জন্ম দিয়েই চলেছেন।
বিশ্বকাপের দুই ম্যাচে ৫ গোল। এর আগে কোনো বিশ্বকাপের শুরুটা এমন করতে না পারা মেসি এবার ‘শেষ বিশ্বকাপ’ খেলতে নেমে অবাক করে চলেছেন নিজেকেই। এই বিশ্বকাপ তো মেসির খেলার কথাই ছিলো না। অথচ, এই আসরেই তিনি হলেন প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। নিজের প্রজন্মের সবাই অবসরের দিকে ছুটলেও মেসি এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা আর ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও তো অকপটে বলেই দিলেন, ‘মেসি বিশ্বসেরা।’
Advertisement
প্রায় বছর চারেক আগে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই স্মরণীয় রাতের পর মেসির ক্যারিয়ারে আক্ষেপ বলতে আর কিছুই নেই। এরপরও চ্যাম্পিয়ন জার্সিতে ও আবহে বিশ্বকাপের মাঠে নামাটা স্রেফ আনন্দের উদ্দেশ্যেই হয়তো। নিজের আনন্দ বাকিদের মাঝেও তিনি কতটা ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেটি আশা করি মেসি বেশ ভালোই আঁচ করতে পারেন।
কাতারের ওই রোমাঞ্চকর রাতের পর সব প্রাপ্তির পরও থেকে যায় সামান্য অপূর্ণতা। মেসি কি অনুভব করেন সেই অপূর্ণতা? প্রশ্নটা করা যায়নি। করলে উত্তরটা হয়তো আর্জেন্টাইন গ্রেট হেসেই উড়িয়ে দেবেন। প্রশ্নটা পরে উল্লেখ করে নিজেরাই মেসির উত্তর ধরে নিই — এমনটা হলে তো মন্দ হয় না। এবারও তো একই লক্ষ্যেই বিশ্বকাপে।
সাধারণত জুন-জুলাইয়ে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। কেবল গরমের কারণে গত আসরটি নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। নইলে প্রতি আসরেই জুনে শুরু হয়ে জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে শেষ হয়। নিজের অভিষেক আসর থেকে চলমান বিশ্বকাপ পর্যন্ত নিজের খেলা ছয় আসরের পাঁচটিই ছিল জন্মদিনের মৌসুমে।
সেখানেই রয়ে গেছে মেসির এক অপূর্ণতা। শেষ পর্যন্ত মেসি বিশ্বকাপ জিতলেও, জন্মদিনের উৎসব করা সম্ভব হয়েছে এমন কোনো আসরেই ছোঁয়া হয়নি বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা। ২০২২ বিশ্বকাপ মেসি জিতলেও সেটির আরম্ভকাল ছিল না তার জন্মদিনের মাসে।
Advertisement
বেঞ্চে বসেই দেখলেন দলের বিদায় (জার্মানি, ২০০৬)শুরুটা মেসির অভিষেক আসর থেকেই করতে হবে। আর্জেন্টিনার ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পাওয়া মেসি সেই আসরে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে গোল করে হয়েছিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ গোলদাতা।
ছোট আয়োজনে কেক কেটে জন্মদিন পালনের দুদিন পর মেক্সিকোর বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন। তুমুল সম্ভাবনাময়ী আর্জেন্টিনা দল কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে পরাজিত হয়ে বাদ পড়ে বিশ্বকাপ থেকে।
মেসির গোলহীন আসর (দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১০)এরপর ২০১০ আসরে কোচ ডিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা লিওনেল মেসি তখন ফুটবল বিশ্বে এক বিরল প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। জন্মদিনে নিজের সাইন করা জার্সি ২৩ বছর বয়সী মেসিকে উপহার দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। মেসির জন্মদিনে অনুশীলনের দিনটি সবাইকে ছুটি দেন প্রয়াত কোচ। দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত বিশ্বকাপে জন্মদিনের সময়টা প্রিটোরিয়ায় মা-বাবা ও স্ত্রীর সঙ্গে কাটান মেসি। তারা সেখানেই ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। পরিবারের সঙ্গে আর্জেন্টাইন আসাদো (বারবিকিউ) আয়োজন করা হয়। ক্যাম্পে ফিরে সতীর্থদের দেওয়া বিশাল কেকও কাটেন তিনি। জন্মদিনের শুভক্ষণে নিজের জন্য সেরা উপহার হতে পারতো ১১ জুলাইয়ের ফাইনালে শিরোপা উঁচিয়ে ধরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে আরও একবার জার্মানির কাছেই। মেসিদের ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে জার্মানরা। আসরে মোট ৪৫০ মিনিট মাঠে খেলে ৩টি অ্যাসিস্ট করেন মেসি। অন্য হিসাবে ৪টি অ্যাসিস্ট। তবে কোনো গোল করতে না পারায় হন সমালোচিত।
মারাকানায় স্বপ্নভঙ্গ (ব্রাজিল, ২০১৪)ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ আসর হলো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের জন্য স্বপ্নভঙ্গের। ফাইনালে পৌঁছেও সেই জার্মানির কাছেই ১-০ গোল হেরে শিরোপাবঞ্চিত হয় মেসির আর্জেন্টিনা। ফাইনালে নিজের সবচেয়ে সুইটেবল পজিশন থেকেও গোল মিস করেন মেসি।
ওই বিশ্বকাপে জন্মদিনে অ্যাডিডাসের কাছ থেকে বিশেষ এক ধরনের বুট উপহান পান মেসি। হোটেলের বাইরে অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগীরা ভীড় জমায় তাকে শুভেচ্ছা জানাতে। জন্মদিনের পরদিন মাঠে নেমে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ে জোড়া গোল করেন মেসি। একটি আবার দারুণ ফ্রি-কিকে। আসরে ৭ ম্যাচে ৪ গোল করে সোনার বল জেতা মেসিকে শেষ পর্যন্ত রাজ্যের হতাশা গ্রাস করে নেয় বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজিত হওয়ার দুঃখে।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদযাপন (রাশিয়া, ২০১৮)বাছাইপর্বে বিপদগ্রস্ত আর্জেন্টিনাকে বলিভিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপে তোলেন মেসি। দলের ভঙ্গুর অবস্থায় ভালোকিছু আশা করা যাচ্ছিল না। সেটা প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ে আরও স্পষ্ট হয়। পেনাল্টি মিস করেন মেসি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের পরাজয়ে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় আগের আসরের রানার্সআপদের বিদায়। এমন তুমুল চাপের মধ্যেই আসে মেসির জন্মদিন। তাই হোটেলে ব্যাপক চাপের মাঝে ছোট পরিসরে কেক কাটা হয় মেসির জন্য।
দুদিন পর ২৬ জুন নাইজেরিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে মাঠে নেমে শুরুতেই গোল করেন মেসি। মাঝে নাইজেরিয়া সমতা ফেরায়। শেষ মুহূর্তে রোহোর গোলে রাউন্ড অব-১৬ নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার। কিন্তু সেই পর্বে সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় মেসি ও আর্জেন্টিনা। জন্মদিনের মাসেই নিতে হয় সেই বিদায়।
আজ মেসি চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে জন্মদিন উদযাপন করছেন। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে ৩৯তম জন্মদিনটি বিশেষই বলা চলে। জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি মেসির ‘শেষ বিশ্বকাপ।’ আর সেই বিশ্বকাপে মেসি যেভাবে শুরু করেছেন, এমনটা আর কোনো আসরেই করেননি। ৫ গোল করে জানান দিচ্ছেন, এবারও মাঠে নেমেছেন শিরোপা জয় করতে। অন্যভাবে বললে, শিরোপা ধরে রাখতে।
অন্য আসরে জন্মদিনের আবহে বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও অনুপ্রেরণা হিসেবে ২০২১ কোপা আমেরিকা তো আছেই। সেবার গ্রুপপর্বের ম্যাচ চলাকালীন মেসির জন্মদিন পালন করা হয় হোটেলে। রাতে তার রুমে কেক ও উপহার নিয়ে আসেন সতীর্থরা। সেই আসরে জন্মদিনের আবহে ব্রাজিলকে হারিয়ে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপাও জিতে নেন মেসি।
সেই সময়টাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে বাকি তিন বিশ্বকাপে জন্মদিনের আবহে শিরোপা জিততে না পারায় আক্ষেপটা এবারই ঘুচাতে পারেন মেসি। সঙ্গে তো দুই ম্যাচে ৫ গোলের আশা জাগানিয়া পারফরম্যান্স আছেই! বিশ্বাস করতে ক্ষতি কী?
আইএন/এমএমআর