আইন-আদালত

নানক-তাপসসহ হত্যায় জড়িতদের শাস্তি চাইলেন শহীদ ফারহানের বাবা

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলামের (ফারহান ফাইয়াজ) বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া (৪৫)।

Advertisement

বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া। এ সময় তিনি মামলার অন্যতম আসামি সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ছেলে হত্যায় জড়িত সবার শাস্তি চান।

মামলার ২৮ আসামির মধ্যে চারজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সাবেক সহ-সভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন ও যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী। নানক, তাপসসহ এই মামলার ২৪ আসামি পলাতক।

আরও পড়ুন সড়কের পর শহীদ ফারহান ফাইয়াজের নামে স্কুলের নামকরণ

জবানবন্দিতে শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালের আইসিইউতে গিয়ে ফারহানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো দেখি। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। একপর্যায়ে চিকিৎসক ওর মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিয়ে কাপড় দিয়ে ওর মুখ ঢেকে দেয়। এতে আমি বুঝলাম, আমার ছেলে আর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে মৃত্যুসনদ দিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল সে ঘটনাস্থলেই মারা গেছে।

Advertisement

তিনি বলেন, আমার একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে ফারহান ফাইয়াজ। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল ১০টায় সে বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে যায়। ওখান থেকে সে তার বন্ধুদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে মিছিল সহকারে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে ধানমন্ডি-২৭ (পুরাতন) নম্বরে অবস্থান নেয়। তারা ছিল নিরস্ত্র। তাদের হাতে কোনো লাঠি সোটা ছিল না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই সময়ে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী, আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

জবানবন্দিতে শহিদুল ইসলাম বলেন, একপর্যায়ে আমার একমাত্র ছেলের বুকে একটি বুলেট ঢুকে যায়। তখন সময় অনুমান দুপুর আড়াইটা। তখন ঘটনাস্থল থেকে এক অভিভাবক আমাকে ফোন করে জানায় যে, ফারহান গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি তখন মালিবাগে আমার অফিসে অবস্থান করছিলাম। একমাত্র ছেলের গুলির খবর শুনে আমি তখন প্রায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন দৌড়ে অফিস থেকে নেমে ধানমন্ডি-২৭ এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই। একই পথে আমার বাসা কাকরাইল সার্কিট হাউস রোডে গিয়ে আমি আমার স্ত্রী ও মেয়েকে ঘটনা বলে ধানমন্ডি-২৭ এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আমার স্ত্রী ও মেয়েকে সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিস্থিতির কারণে আমি নিতে পারিনি। রাস্তা ঘাটে কোনো ট্রান্সপোর্ট ছিল না। আমি কিছুটা পথ হেঁটে, কিছুটা পথ দৌড়ে এবং কিছুটা পথ রিকশায় করে যাওয়ার পথে আরেকটা ফোন আসে যে, আমার ছেলেকে লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আমাকেও সেখানে যেতে বলেছে।

আরও পড়ুন পাল্টে গেল সড়কের নাম, ‘নানক চত্বর’ থেকে হলো ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ সরণি’

তিনি বলেন, হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই ফারহানের মামা মিজানুর রহমানকে ফোন করি। তার বাসা মোহাম্মদপুরে। আমার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ফারহানের মামা তার স্ত্রীসহ লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে পৌঁছায়। আমি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর হাসপাতালে এক বীভৎস অবস্থা দেখতে পাই। অনেক ছাত্র রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। আমি দৌড়ে আইসিইউতে উঠে দেখলাম ফারহানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। একপর্যায়ে ডাক্তার ওর মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিল এবং কাপড় দিয়ে ওর মুখ ঢেকে দিল। তাতে আমি বুঝলাম আমার ছেলে আর নেই।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং স্কুলের প্রিন্সিপাল হাসপাতালে উপস্থিত হয় এবং কলেজের মাঠে জানাজা দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ জানায়। আমি সম্মত হই। কিন্তু আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ এমনভাবে হাসপাতাল ঘিরে রেখেছিল যে, বের হওয়া যাচ্ছিল না। আমরা অনেক কষ্টে হাসপাতালের পিছনের গেট দিয়ে ফারহানের মরদেহ নিয়ে আল মারকাজুল লাশ দাফন কেন্দ্রে নিয়ে গোসল সম্পন্ন করাই। সেখান থেকে মরদেহ ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ মাঠে নিয়ে যাই। সেখানে বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রথম নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে ফ্রিজিং গাড়িযোগে ফারহানের মরদেহ নিয়ে আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেই। পথিমধ্যে কাকরাইল সার্কিট হাউস রোড থেকে আমার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে আরেকটি মাইক্রোবাসযোগে রওনা হই। প্রথমে কাকরাইল মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হই।

Advertisement

তিনি জানান, দ্বিতীয়বার আমরা যাত্রাবাড়ী মোড়ে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক বাধার সম্মুখীন হই। আমাদের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। অনেক কষ্টে আমরা যেতে পেরেছি। মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর সেখানকার স্থানীয় আওয়ামী বাহিনী লাশ দাফন করার জন্য আমাদের মাত্র ৪০ মিনিট সময় দিয়েছিল। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে জানাজা সম্পন্ন করে মরদেহ দাফন করি।

আরও পড়ুন সবাই ক্লাসে ফিরলেও নেই শুধু ফাইয়াজ

ট্রাইব্যুনালে শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার একমাত্র ছেলের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, আমি তাদের শাস্তি দাবি করছি। ঘটনার পরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও ফুটেজ, পত্রপত্রিকার মাধ্যমে যাদের দেখেছি ও নাম জানতে পেরেছি তাদের আসামি করেছি মামলায়। ফারহানের সঙ্গে যারা আন্দোলনে ছিল তাদের মাধ্যমেও জানতে পেরেছি কারা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, এডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়াদ্দার, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি রৌশানুল হক সৈকত, ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সাত্তার, তোফায়েল আহম্মেদ, মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, সৈয়দ হাসান নূর রাষ্ট্রন, ইসমাইল হোসেন, মো. মাসুদুর রহমান বিপ্লব, ফজলে রাব্বি, আহাদ হাসানসহ অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও ৫/৭ জন আছে, যাদের নাম এই মুহূর্তে মনে নেই।

এফএইচ/এমএমকে