বর্তমানে রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অলিগলিতে চোখ রাখলেই দেখা যায়-একসঙ্গে কয়েকজন তরুণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডায় অযথা সময় পার করছেন। অথচ এই তরুণদের মধ্যে অনেকের চোখেই কয়েক বছর আগেও ছিল উজ্জ্বল স্বপ্নের দীপ্তি-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন, পড়াশোনা শেষে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন আর নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তবে আজ তাদের চোখে সেই উজ্জ্বলতা আর নেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে অনিশ্চয়তা, হতাশা আর এক অদৃশ্য শিকল-যা মাদকাসক্তির শিকল। ধীরে ধীরে দেশের হাজারো তরুণের স্বপ্নকে গ্রাস করে নিচ্ছে মাদকের কালো ছায়া, নিভিয়ে দিচ্ছে সম্ভাবনার আলো।
Advertisement
বাংলাদেশ একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ, উন্নয়নের চালিকাশক্তি এবং আগামী দিনের নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় মুখ। তবে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সমাজের একাংশ তরুণ আজ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে তাদের শিক্ষা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও পড়ুন মাদক: এইচআইভিসহ নানা জীবাণুর বাহক হতে পারেমাদকাসক্তির শুরুটা অনেক সময় কৌতূহল থেকেই হয়। স্কুলজীবনে অনেক কিশোর-কিশোরী বন্ধুদের আড্ডা, সহপাঠীদের জোরাজুরি, আধুনিক ই-সিগারেটের স্বাদ নেওয়া কিংবা পারিবারিক ঝামেলা ও প্রেমঘটিত কারণে সৃষ্ট মানসিক অবসাদ-এসবের কারণে প্রথমবারের মতো মাদকের সংস্পর্শে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেকেই মনে করে ‘একবার চেষ্টা করলে কিছু হবে না’- কিন্তু সেই একবারই অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলে পরিণত হয়।
ধীরে ধীরে সেই কৌতূহল অভ্যাসে রূপ নেয়। বিড়ি বা সিগারেট দিয়ে শুরু হলেও এক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। ফলে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে এবং অনেকেই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়েন। যে শিক্ষার্থীরা একসময় ভালো ফলাফল করতেন, তাদের অনেকেই মাদকের কারণে জীবনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি তারা পরিবার থেকেও দূরে সরে যায়। যাদের চোখে একসময় স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা ব্যবসায়ী হওয়ার কিংবা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের হাল ধরার-তবে সেই স্বপ্নের পথে আর এগিয়ে যেতে পারেন না। মাদকের অন্ধকারে ডুবে নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হন।
Advertisement
শুধু তাই নয়, এসব তরুণরা পরিবার ও সমাজের চোখে এক ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তারা মাদকের নেশায় ডুবে থাকেন। পরিবারের কারো অসুস্থতা, সমস্যা বা দুঃখ-কষ্ট কোনো কিছুর প্রতিই তাদের আর কোনো দায়িত্ব বা চিন্তা থাকে না।
অন্যদিকে, তারা বাবার কষ্টার্জিত অর্থ মাদকের পেছনে নষ্ট করতে থাকেন। যাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল, তারা মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এতে অনেক পরিবার সন্তানের কারণে নিঃস্ব হয়ে যায়।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, অনেকের আচরণও সম্পূর্ণ বদলে যায়। এসব তরুণরা মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মা-বাবার গায়েও হাত তোলার মতো চরম ও দুঃখজনক ঘটনাও ঘটে। একসময় যে সন্তানকে ঘিরে পরিবারের স্বপ্ন ছিল, সেই সন্তানই হয়ে ওঠে পরিবারের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তির পেছনে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয় পারিবারিক ও সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগের অভাব রয়েছে। বাবা-মা কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানের মানসিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারেন না। আবার অনেক তরুণ পড়াশোনা, চাকরি কিংবা সম্পর্কজনিত চাপ সামলাতে না পেরে হতাশায় ভোগে। এই হতাশা থেকে মুক্তি খুঁজতে গিয়েই কেউ কেউ মাদকের আশ্রয় নেয়।
Advertisement
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতার কারণে এ কাজে তরুণরা দ্রত জরিয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও মাদক কারবারিরা নতুন নতুন কৌশলে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, শহরের কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং অপরাধপ্রবণ চক্রগুলো তরুণদের টার্গেট করছে।
মাদক প্রতিরোধে পরিবারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখা অত্যন্ত জরুরি। শুধু ভালো ফলাফল বা ক্যারিয়ার নিয়ে চাপ সৃষ্টি না করে সন্তানের অনুভূতি ও সমস্যার কথাও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক জাহিদ ইকবাল বলেন, ‘মাদক আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ভয়াল ছোবলে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং একসময় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যে তরুণ একদিন বড় হয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখত, সে আজ মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু একজন মানুষের নয় একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি জাতির ক্ষতি।’
‘দুঃখজনক হলেও সত্য, আমার নিজ এলাকা নিকুঞ্জ-টানপাড়া খিলক্ষেতেও মাদকের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে আমরা এ নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং মাদকের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’
আরও পড়ুন মাদকের ভয়াল ছোবলে শিশু-কিশোরতিনি বলেন, ‘মাদকমুক্ত সমাজ গড়া শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আজকের একজন তরুণকে মাদকের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারলে আমরা একটি সুন্দর আগামীকে রক্ষা করতে পারব।’
প্রতিটি তরুণ একটি সম্ভাবনা, একটি আলোর প্রদীপ। তাদের চোখে লুকিয়ে আছে অসংখ্য স্বপ্ন, যা একদিন পরিবার, সমাজ এবং দেশকে আলোকিত করতে পারে। সেই স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে আজই আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণদের ওপর। আর তরুণদের হারিয়ে যাওয়া মানে ভবিষ্যতের হারিয়ে যাওয়া।
সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সামাজিক সংগঠন- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। মাদক কারবারির শিকড় উপড়ে ফেলার পাশাপাশি তরুণদের জন্য নিরাপদ, সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
কেএসকে