ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর (রা.) শাহাদাতের পর মুসলমানদের অধিকাংশ হজরত মুয়াবিয়াকে (রা.) খলিফা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন নবীজির (সা.) নাতি ও হজরত আলীর (রা.) জ্যেষ্ঠ সন্তান হাসান (রা.)। তিনি মুয়াবিয়ার (রা.) সঙ্গে সমঝোতা করে মুসলমানদের মধ্যে চলতে থাকা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটান। পাশাপাশি শর্ত দেন যে, মুয়াবিয়ার (রা.) পর খলিফা মনোনীত হবেন মুসলমানদের মত ও সমর্থনের ভিত্তিতে যেমন নবীজির (সা.) পর খলিফায়ে রাশেদরা মনোনীত হয়েছিলেন।
Advertisement
কিন্তু হজরত মুয়াবিয়া (রা.) জীবনের শেষ দিকে এই সমঝোতা থেকে সরে যান এবং নিজের ছেলে ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করেন। তার জন্য মানুষের বাইআত বা সমর্থন গ্রহণ করা শুরু করেন। তখন হোসাইন (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং ইয়াজিদকে খলিফা মেনে বাইআত করতে অস্বীকার করেন। এরপরও মুয়াবিয়া (রা.) নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
হজরত মুয়াবিয়ার (রা.) মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খলিফা হন এবং মদিনায় নিযুক্ত শাসনকর্তা ওয়ালিদ ইবনে উতবার মাধ্যমে হজরত হোসাইনসহ (রা.) অন্য গুরুত্বপূর্ণ সাহাবিদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা শুরু করেন।
অন্যদিকে ইরাকের বেশ কিছু মানুষ হোসাইনের (রা.) কাছে পত্র পাঠিয়ে তাকে ইরাকে যেতে এবং খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনুরোধ করে। হজরত আলীর (রা.) খেলাফতের রাজধানী ছিল ইরাক। ফলে ইরাকে তার প্রচুর সমর্থক ছিল।
Advertisement
ইরাকে যাওয়ার ব্যাপারে হজরত হোসাইনের (রা.) দ্বিধা ছিল। কিন্তু ইরাকবাসীর কাছ থেকে প্রচুর চিঠি আসায় শেষ পর্যন্ত তিনি ইরাকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে ইরাকের দিকে রওয়ানা হন এবং কারবালায় পৌঁছেন—যা কুফার নিকটবর্তী একটি স্থান। সেখানে ইয়াজিদের নিযুক্ত কুফার শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের সৈন্যরা তার মুখোমুখি হয়।
কারবালার অসম লড়াইহজরত হোসাইন (রা.) কোনো রকম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তার সঙ্গে কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, বরং ছিল তার পরিবারের কিছু মানুষ। ইরাকবাসী তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার সমর্থনে এগিয়ে আসবে, তাকে সাহায্য করবে এ রকমই আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু ইরাকবাসী বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। ফলে কুফার ইয়াজিদ নিযুক্ত শাসনকর্তা ইবনে জিয়াদের প্রায় বাইশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর সাথে তার ও তার সঙ্গীদের একটি অসম লড়াই হয় এবং ৬১ হিজরির ১০ মহররম পবিত্র আশুরার দিন তিনি শহীদ হন।
বর্ণিত আছে, শাহাদাতের পর হজরত হোসাইনের (রা.) শরীরে ৩৩টি ছুরিকাঘাত ও ৩৪টি তরবারির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল।
তার সঙ্গে তার দুই ছেলে আলী আল-আকবর ও আব্দুল্লাহ, তার ভাই জাফর, মুহাম্মদ ও আতীক, আব্বাস আল-আকবর, তার ভাতিজা কাসিম ইবনে হাসান, তার চাচাতো ভাই মুহাম্মদ ও আওন (আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবি তালিবের ছেলে), মুসলিম ইবনে আকিল ইবনে আবি তালিব ও তার দুই পুত্র আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমানসহ তার মোট ৮২ জন সঙ্গী শহীদ হন।
Advertisement
তার পরিবারের সবাই নিহত হননি—যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, আলী আল-আসগর (হোসাইনের (রা.) ছোট ছেলে), হাসান ইবনে হাসান ইবনে আলী, আমর ইবনে হাসান, কাসিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর, তার দুই মেয়ে ফাতিমা ও সাকিনা, তার স্ত্রী রাবাব আল-কালবিয়্যা (সাকিনার মা), উম্মে মুহাম্মদ বিনতে হাসান ইবনে আলী প্রমুখ।
ইয়াজিদ কি হোসাইনকে (রা.) হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন?নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াজিদ সরাসরি হজরত হোসাইনকে (রা.) হত্যার নির্দেশ দেননি, শুধু তার অগ্রযাত্রা রোধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত হোসাইনের (রা.) হত্যাকাণ্ডের খবর দামেশকে পৌঁছলে প্রথমত ইয়াজিদ খুশি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এ ঘটনার জন্য লজ্জিত হন। তিনি আফসোস করে বলতেন, আমার কী ক্ষতি হতো যদি আমি হোসাইনের সাথে বসতাম, তিনি যা চান সে অনুযায়ী সমঝোতা করতাম। আমার ক্ষমতা দুর্বল হলেও আল্লাহর রাসুলের (সা.) হকের জন্য আমি তা করতাম। আল্লাহর লানত ইবনে মারজানার (কুফার শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ) ওপর সে তাকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছে। তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফিরে যাবেন অথবা আমার কাছে এসে আমার সঙ্গে সমঝোতা করে নেবেন অথবা কোনো সীমান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাবেন। ইবনে জিয়াদ তার প্রস্তাব গ্রহণ না করে তাকে হত্যা করেছে আর আমাকে মুসলমানদের কাছে ঘৃণিত বানিয়েছে, তাদের অন্তরে আমার প্রতি শত্রুতা সৃষ্টি করেছে। (আল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, তারিখে ইবনে আসাকির)
কিন্তু পরে এসব কথা বললেও হত্যাকাণ্ডের পরপর ইয়াজিদ এটা অপছন্দ করেননি, পরেও তিনি হত্যাকাণ্ডের বিচার করেননি, দোষীদের শাস্তি দেননি যা তার কর্তব্য ছিল।
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর হজরত হোসাইনের (রা.) পরিবারকে দামেশকে নেওয়া হলে ইয়াজিদ তাদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করেছিলেন এবং তাদেরকে সসম্মানে মদিনায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
ওএফএফ