খেলাধুলা

আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচের আগে আলোচনায় কুখ্যাত সেই গিজন কেলেঙ্কারি

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যা চিরতরে বদলে দিয়েছে খেলাটিকে। তেমনই একটি ম্যাচ ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা কুখ্যাত ‘ডিসগ্রেস অব গিজন’ নামে পরিচিত। স্পেনে অনুষ্ঠিত সেই বিকেলের ম্যাচে দুই দল এমন একটি ফলাফল নিশ্চিত করেছিল, যাতে তারা দুটিই পরের রাউন্ডে উঠে যায় এবং আগের দিন নিজেদের ম্যাচ খেলে ফেলা আলজেরিয়া গোল ব্যবধানে বিদায় নেয়।

Advertisement

‘আমাদের জন্য এটি একটি ফিরতি লড়াই,’- বলেন ২৩ বছর বয়সী আলজেরিয়ান সমর্থক আরসলান আৎশি। তিনি তার বাবা-মায়ের থেকে পুরো ঘটনাটি শুনেছেন। তিনি বলেন, ‘সবাই একই বিষয় নিয়ে কথা বলছে। আশা করি খেলোয়াড়রাও আমাদের মতোই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

আলজেরিয়ার ব্লিদায় জন্ম নেওয়া আৎশি পরে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে চলে যান এবং বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার প্রথম দুই ম্যাচ দেখেছেন।

সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল আলজেরিয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে জিতে যায় জার্মানি, যারা পরে বিশ্বকাপও জিতেছিল।

Advertisement

এবার কানসাস সিটিতে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। অনেক আলজেরিয়ান নাগরিকের কাছে অস্ট্রিয়াই তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ, কারণ ১৯৮২ সালের ওই বিকেলে ১-০ গোলের হার মেনে নিয়ে তারাই আলজেরিয়াকে বিদায়ের পথে ঠেলে দিয়েছিল।

সেবার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের আগে অস্ট্রিয়ার ছিল ৪ পয়েন্ট, আর পশ্চিম জার্মানি ও আলজেরিয়ার ছিল ২ পয়েন্ট করে। আলজেরিয়া আগে চিলির বিপক্ষে খেলেছিল এবং জিতে সাময়িকভাবে গ্রুপের শীর্ষে উঠে যায়। শেষ ম্যাচে যদি অস্ট্রিয়া জিতত, তাহলে আলজেরিয়া কোয়ালিফাই করত। পশ্চিম জার্মানি যদি তিন বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জিতত, তাহলেও তারা পরের রাউন্ডে উঠে যেত। কিন্তু জার্মানি যদি ১ বা ২ গোলের ব্যবধানে জিতত, তাহলে বিদায় নিতে হতো আলজেরিয়াকে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল? পশ্চিম জার্মানির ১-০ জয়। ম্যাচের ১০ মিনিটে গোল করেন হর্স্ট হ্রুবেশ। এরপর কার্যত আর তেমন কিছুই ঘটেনি।

মূলত আলজেরিয়া সেবার প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল। গ্রুপ পর্বেই পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে বড় অঘটন ঘটিয়েছিল তারা। গ্রুপে পরের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার কাছে আলজেরিয়া ২-০ গোলে হারলেও শেষ ম্যাচে চিলিকে তারা ৩-২ গোলে হারিয়ে দেয়। এরফলে আলজেরিয়ার পয়েন্ট দাঁড়ায় ৪।

Advertisement

গ্রুপের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে পশ্চিম জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া। ততক্ষণ পর্যন্ত শীর্ষে আলজেরিয়া। এ পর্যায়ে অস্ট্রিয়াকে যদি ১-০ বা ২-০ গোলে হারায় জার্মানি, তবে উভয় ইউরোপের এই দুই দলই পরবর্তী রাউন্ডে উঠে যাবে এবং দারুণ পারফর্ম করেও আলজেরিয়া গোল ব্যবধানে বাদ পড়ে যাবে।

আলজেরিয়ার শেষ ম্যাচটি এক দিন আগেই শেষ হয়েছিল। তাই পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া ঠিক করে নিয়েছিল, তারা আলজেরিয়াকে কোনোভাবেই পরের রাউন্ডে যেতে দেবে না। তাদের কাছে সমীকরণও জানা ছিল। এ কারণে ম্যাচের ১০ মিনিটে জার্মানি ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর, দুই দলই আক্রমণ করা বন্ধ করে দেয়। পরের পুরোটা সময় তারা শুধু বল নিজেদের রক্ষণভাগে পাস করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জয় জার্মানির এবং আলজেরিয়ার বিদায়। পরের রাউন্ডে উঠে যায় জার্মানি ও অস্ট্রিয়া।

২০২২ সালে দ্য স্কটসম্যান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই ম্যাচের স্কটিশ রেফারি বব ভ্যালেন্টাইন বলেন, ‘নিজেকে বোঝাতে আমার কিছুটা সময় লেগেছিল যে, এই খেলোয়াড়রা আর নিজেদের উজাড় করে খেলবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিরতির সময় আমি লাইনসম্যানদের সঙ্গে কথা বলি। তারাও একই মত দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, বল মাঠের বাইরে গেলেও কেউ সেটি আনতে যাচ্ছিল না।’

খেলোয়াড়রা যখন বারবার আড়াআড়ি ও পেছনের দিকে পাস দিতে থাকেন, তখন ৪০ হাজারের বেশি দর্শক ক্ষোভে ফেটে পড়েন। গ্যালারি থেকে ভেসে আসে, আউট, আউট! কিংবা, ওদের চুমু খেতে দাও, চুমু খেতে দাও!- এমন স্লোগান। কেউ কেউ বেড়ার ফাঁক দিয়ে টাকার নোটও দেখাতে শুরু করেন। ম্যাচের শেষদিকে স্টেডিয়ামজুড়ে শোনা যায় দুয়ো ও শিস।

স্প্যানিশ টেলিভিশনের একটি প্রামাণ্যচিত্রে পশ্চিম জার্মানির গোলরক্ষক হ্যারল্ড শুমাখার বলেছিলেন, ‘আমরা জনপ্রিয় হতে খেলিনি, ফল পাওয়ার জন্য খেলেছি। এটাই সব।’

গিহনের সেই কেলেঙ্কারি ফুটবলকে চিরতরে বদলে দেয়, কারণ এরপরই ফিফা বিশ্বকাপের নিয়ম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের সব ম্যাচ একই সময়ে আয়োজন করা হয়, যাতে কোনো দল ফলের হিসাব কষে খেলতে না পারে।

আলজেরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানালেও তখন আর কিছুই পরিবর্তন হয়নি, কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচে অংশ নেওয়া কোনো দলই নিয়ম ভঙ্গ করেনি। কিন্তু সেই ক্ষত আজও রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে প্রতিশোধের আকাঙ্খাও।

আরএএইচইউএল/আইএইচএস/