আন্তর্জাতিক

চীনা ধনকুবেরকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিলো যুক্তরাষ্ট্র

বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ ও প্রতারণার মামলায় চীনা এক ধনকুবেরকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ওই ব্যবসায়ীর নাম গুও ওয়েনগুই, যাকে একসময় চীনের সেরা ধনীদের একজন বলে বিবেচনা করা হতো।

Advertisement

চীনে বসবাসকালে গুও রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৭ সালে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তবে সব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করে আসছিলেন গুও।

রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি নিজেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, তথা চীনের সরকারের একজন কড়া সমালোচক হিসেবে নিজেকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেন।

অনলাইনে একনিষ্ঠ কিছু অনুসারীও পেয়ে যান এই ধরকুবের। কিন্তু পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে।

Advertisement

মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় গুও-কে তিন দশকের কারাদণ্ড দিয়েছেন নিউইয়র্কের একটি আদালত। চীনে যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, ব্যবসায়ী গুও তাদের শোষণ করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালতের বিচারক অ্যানালিসা টরেস।

আত্মসাৎ করা অর্থ তিনি নিজের বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য ব্যয় করেছেন বলেও জানানো হয়েছে।ব্যবসায়ী গুও তার সমর্থকদের কাছে মাইলস গুও এবং হো ওয়ান কোয়োকসহ আরও অনেক নামে পরিচিত। রায় ঘোষণায় তাদের অনেকেই আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শন এস বাকলি রায়ের পর বিবিসিকে বলেন, লোভে পড়ে গুও হাজার হাজার মানুষের বিশ্বাসের অপব্যবহার করেছেন।

বাকলি আরও বলেন, আজকের এই রায় দেখিয়ে দিয়েছে যে, খ্যাতি ও সম্পদ আপনাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না এবং যারা নিজের সুখ-সমৃদ্ধির স্বার্থে পরিবারকেই শিকার বানাতে দ্বিধা করেন না, সেই প্রতারকদের কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়।

Advertisement

চীন থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে গুও আবাসন ব্যবসা করতেন এবং এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। চীনা সরকারের সঙ্গেও তখন তার সুসম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়।

কিন্তু পরে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন চীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এরপর শাস্তি এড়াতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর থেকে গুও চীনের কমিউনিস্ট শাসনের কড়া সমালোচক হয়ে ওঠেন। এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমেই তার পরিচিতি বাড়তে থাকে এবং অনলাইনে একনিষ্ঠ অনেক অনুসারীও তৈরি হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন ছাড়াও চীন সরকারের অন্যান্য সমালোচকদের সঙ্গেও একপর্যায়ে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং নিজের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে গুও ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তার ভক্ত ও অনুসারীদের কাছ থেকে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন।

কথা ছিল চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এসব অর্থ ব্যবহৃত হবে। কিন্তু তা না করে গুও সেই অর্থ নিজের বিলাসী জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করেন।

ভক্ত ও সমর্থকদের দেওয়া অর্থে তিনি ৫০ হাজার বর্গফুটের বিশাল একটি প্রাসাদ কিনেছেন। সেইসঙ্গে, ১০ লাখ ডলার দিয়ে একটি ল্যাম্বরগিনি গাড়ি এবং তিন দশমিক সাত কোটি ডলার ব্যয় করে একটি বিলাসবহুল ইয়টেরও মালিক হয়েছেন।

রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হলেও গুও অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ভক্ত ও সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এবং গুও প্রায়ই অনলাইন ভিডিওতে উপস্থিত হতেন এবং ২০২০ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ‘নিউ ফেডারেল স্টেট অব চায়না’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেন।

সেই বছরের শেষের দিকে, কানেকটিকাটে গুও-এর ইয়ট থেকে ব্যাননকে গ্রেফতার করা হয়। একটি অলাভজনক সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের জন্য অর্থায়নকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতারণার একটি কথিত পরিকল্পনার অভিযোগে একটি মামলায় ব্যাননের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়।

ব্যানন ম্যানহাটনের একটি আদালতে প্রথম শ্রেণির প্রতারণার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং তিন বছরের জন্য শর্তসাপেক্ষ মুক্তির সাজা পান।

ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি কর্তৃক অভিযুক্ত হওয়ার পর প্রাচীর নির্মাণ অভিযানের জন্য তাকে ফেডারেল অভিযোগেরও মুখোমুখি হতে হয়েছিল, কিন্তু হোয়াইট হাউসে তার প্রথম মেয়াদের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দিলে সেই বিচার প্রক্রিয়া থেমে যায়।

টিটিএন