গুজরাট, কেরালা, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও উত্তর প্রদেশের পর এবার সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কড়া আইনের পথে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। সম্প্রতি রাজ্যের বিধানসভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড, সংগঠিত অপরাধ, দাঙ্গা রোধ এবং বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা নিলামে তুলে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল আনা হয়েছে।
Advertisement
বিলগুলো হলো ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল-২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড পাবলিক অর্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’, যা মূলত গুন্ডা দমন বিল নামেই পরিচিত।
আরও পড়ুন ‘ভিসা আমরা চিরদিনই দিতাম, বাংলাদেশকে আমাদেরই অঙ্গ মনে করি’গত সোমবার (২৯ জুন) বিধানসভার চলতি অধিবেশনের শেষ দিনে এই বিল উত্থাপন করা হয়। বিল পেশ করেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা। এরপর বিলের ওপর সরকার ও বিরোধী পক্ষের বিধায়করা বক্তব্য রাখেন। অবশেষে কণ্ঠভোটে একযোগে বিলটি পাস হয়। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৭৬টি, বিপক্ষে পড়ে ৪১টি এবং ২০ জন বিধায়ক ভোটদানে বিরত ছিলেন।
কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে উঠে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আগের আইনে অনেক ফাঁকফোকর ছিল, কিন্তু বর্তমান আইনে কোনো ফাঁকফোকর রাখা হলো না। এই আইন কেবলমাত্র গুন্ডাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমরা কোনো ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করব না। নিশ্চিন্তে থাকুন, এর অপব্যবহার হবে না। এই আইন কারো ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।’
Advertisement
সিএএ, এনআরসি কিংবা ওয়াকফ আইনের বিরোধিতা করে বিগত তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে রাজ্যের একাধিক জায়গায় অবরোধ ও সহিংসতার অভিযোগ উঠেছিল। এ ছাড়া সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, লুটপাট এবং বাস, ট্রেন, গাড়ি, বাইক ও সরকারি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছিল।
আরও পড়ুন ‘অসহায়ত্ব কাটবে’ / বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালুর খবরে খুশির হাওয়া কলকাতায়সেই বিষয়টি তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দাঙ্গা, বেআইনি সমাবেশ, হিংসাত্মক বিক্ষোভ রোধ করা এবং সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রচলিত ফৌজদারি আইনে অপরাধীদের বিচার এবং শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত মূল্যায়ন ও প্রকৃত দোষীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেই। সে কারণেই এই আইন প্রয়োজন। তবে শুধু জেল দিয়েই ছেড়ে দেব না। দ্রুত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে। এরপর তা নিলামে চড়িয়ে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।’
দুর্বৃত্তদের ভিটামাটি ছাড়া করার হুঁশিয়ারিশুভেন্দু অধিকারী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘দুর্বৃত্তদের ভিটামাটি ছাড়া করব। এখানে কোনো দাঙ্গাবাজের স্থান নেই। যার অতীতের রেকর্ড খারাপ থাকবে, সে যে দলেরই হোক না কেন, এক বছর প্রিভেন্টিভ অ্যারেস্টে (প্রতিরোধমূলক আটক) থাকবে।’
এ সময় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতির অভিযোগ এনে শুভেন্দু বলেন, ‘তিনি যদি শক্ত হাতে ধরতেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী চাইতেন, ক্ষতিপূরণ দিতেন, তবে গুন্ডারা এই সাহস পেত না। বাড়তে বাড়তে অপরাধ এই জায়গায় এসেছে। উনি যদি এই আইন মানতে না চান, তবে ইন্ডিয়া জোটের অন্য কোনো রাজ্যে গিয়ে বিরোধিতা করুন, আমাদের এখানে বিরোধিতা করবেন না। কেবলমাত্র ভুল পথে পরিচালিত করে আজকে মুসলিমদের এই হাল করা হয়েছে।’
Advertisement
এদিন রাজ্যের ‘অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী’ (ওবিসি) সংরক্ষণ ক্ষেত্রেও এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকার। বিগত বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে তৈরি ওবিসি তালিকার আইনি জটিলতা কাটাতে এবং অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের কাজের পরিধি বাড়াতে বিধানসভায় পাস করা হয়েছে নতুন দুটি সংশোধনী বিল। এই দুটি বিল হলো ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (রিজার্ভেশন অব ভ্যাকান্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’।
বিল দুটি পেশ করেন অনগ্রসর শ্রেণী উন্নয়ন মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। এরপর বিলের ওপর বক্তব্য রাখেন বিজেপি ও বিরোধী দলের বিধায়করা। পরিশেষে কণ্ঠ ভোটে তা পাস হয়।
আগস্টে আসছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিলএদিন একাধিক বিল পাস হলেও দেশের সব সম্প্রদায়ের জন্য এক ও অভিন্ন আইনের লক্ষ্যে ‘দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড ওয়েস্ট বেঙ্গল-২০২৬’ (ইউসিসি) বিল পেশ করেনি রাজ্য সরকার।
অবশ্য অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে এই বিল নিয়ে বিবৃতি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, ইউসিসি বিল আনব এবং এটি কার্যকর হবে। এই বিলের জন্য আগামী ২ জুলাই মন্ত্রিসভায় খসড়া আনা হবে। আসাম, গুজরাট এবং উত্তরাখণ্ডের অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে ভিত্তি করে আমরা ইউসিসি বিল আনতে চলেছি। এই রাজ্যে একটিই আইন চলবে, ধর্মের ভিত্তিতে দুটো আইন চলবে না।’
ইউসিসি বিলের রূপরেখা ঠিক করতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী আগস্ট মাসে বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ করা হবে।
ডিডি/কেএএ/