জীবন সব সময় আমাদের হিসাব বা যুক্তি অনুযায়ী চলবে না। এমন কিছু মুহূর্ত আসবে যখন আপনারা নিজেদের সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে বলে মনে করবেন। এমন কিছু দিন আসবে যখন মনে হবে কাঁধের ওপর চেপে বসা বোঝার ভার বহনের ক্ষমতা আপনাদের আর নেই। এমন অনেক সময় আসবে যখন কোনো কিছুই আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটবে না। তখন সব কিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখুন।
Advertisement
মাঝে মাঝে আমরা ভাবি সবকিছুর চাবিকাঠি বুঝি আমাদেরই হাতে। প্রতিটি ফলাফল, প্রতিটি সম্পর্ক এবং প্রতিটি পরিস্থিতি আমরা নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু যখন সবকিছু আমাদের মনের মতো হয় না, আমরা যা কিছু ঠিক করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, তা যখন আরও খারাপের দিকে যায়, তখন আমরা আতঙ্কিত হতে শুরু করি। আমাদের মধ্যে চরম দুশ্চিন্তা ভর করে। আমরা প্রশ্ন করতে থাকি, কেন শুধু আমার সাথেই এমন হলো? আমি কী ভুল করেছি?
আমরা ভুলে যাই যে আমরা নিজেরা নিজেদের ভাগ্যের পরিকল্পনাকারী নই। যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আপনার আত্মাকে রূপ দিয়েছেন, যিনি আপনার জন্মের আগেই আপনার জীবনের গল্প লিখে রেখেছেন—একমাত্র তিনিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক এবং তাঁর পরিকল্পনা আমাদের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম। যদি আমাদের দুঃখ-দুর্দশার কোনো কারণ যৌক্তিকতা খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলেও বিশ্বাস রাখতে হবে যে কষ্টের এই মুহূর্ত বা যন্ত্রণার এই দিনগুলোর পেছনে কোনো কল্যাণ আছে।
আরও পড়ুন আল্লাহর রহমতের আশা হারাবেন না: মুফতি মেনকহতে পারে আপনার হৃদয় আজ ভীষণভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। হতে পারে আপনি আপনার খুব প্রিয় কোনো মানুষকে হারিয়েছেন। এমনও হতে পারে যে আপনি বারবার দোয়া করে যাচ্ছেন, কিন্তু কোনো উত্তর পাচ্ছেন না। আপনি রাতে একা একা কাঁদেন। চারপাশটা মানুষের ভিড়ে ঠাসা থাকার পরও আপনি নিজেকে ভীষণ একা মনে করেন, আর এই সবকিছু নিয়েও আপনি বেঁচে আছেন, সামনে এগিয়ে চলছেন। আপনার এই শক্তি, এই সবর, এই নীরব সহনশীলতা কিন্তু আল্লাহ দেখছেন। আল্লাহ আপনার প্রতিটি ফোঁটা চোখের জল দেখছেন, আপনার প্রতিটি দোয়া শুনছেন এবং আপনার ব্যথিত হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
Advertisement
মানুষ অসুস্থ হলে সাধারণত শুরুতেই হাতের কাছে থাকা কোনো ওষুধ সেবন করে। তাতে কাজ না হলে ডাক্তারের দ্বারস্থ হয়। ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে ওষুধ দিলে মানুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পায় এই ভেবে যে, রোগমুক্তির একটা ব্যবস্থা হলো। কিন্তু চিকিৎসাতেও যখন কোনো উন্নতি হয় না এবং সব উপায় ব্যর্থ মনে হয়, তখন আমাদের একটু থেমে গভীরভাবে ভাবা উচিত আল্লাহ একজন মুমিনকে কেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেন, যেখানে কোনো ব্যবস্থাপনাই কাজ করে না? এর কারণ এই নয় যে আল্লাহ আপনাকে অপছন্দ করেন। বরং তিনি আপনার প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। আমরা প্রায়ই বিপদে যে প্রথম পদক্ষেপটির কথা ভুলে যাই, তিনি আমাদের ঠিক সেই জায়গায় ফিরিয়ে নিতে চান—আর তা হলো একমাত্র তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা।
আরও পড়ুন মা ও স্ত্রীর দ্বন্দ্বে কার পক্ষ নেবেন? যা বললেন মুফতি মেনকআমরা দিনে কতবার নামাজে তিলাওয়াত করি ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’ অর্থাৎ ‘আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি’। কিন্তু যখন কোনো বিপদ বা মুসিবত আমাদের আঘাত করে, তখন আমাদের সেই ঘোষণা কোথায় হারিয়ে যায়? আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে কেন আমরা ভুলে যাই? আমরা যদি শুরুতেই সম্পূর্ণভাবে ডাক্তার, ওষুধ কিংবা গুগলে যা পড়ছি তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তবে আমরা শুরুতেই লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গেলাম।
চিকিৎসা গ্রহণ করার মধ্যে কোনো ভুল নেই, কিন্তু বড় ভুলটি হলো সুস্থতার আসল মালিক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে বাহ্যিক উপায়ের ওপর অন্ধভাবে ভরসা করা। একজন প্রকৃত মুমিন এটা খুব ভালো করেই বোঝেন যে সবকিছুর শুরু আল্লাহকে দিয়ে হয়। হ্যাঁ, আমরা ওষুধ খাব। ডাক্তারের কাছে যাব। তবে এই সবকিছুর আগে আমরা আমাদের দুই হাত তুলে বলব, ‘হে আল্লাহ, আমাকে সঠিক পথ দেখান। হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থতা দান করুন। হে আল্লাহ, আমার এই পথ চলা সহজ করে দিন।’
আরও পড়ুন জীবনের ম্যাচ একটি ফুটবল ম্যাচের মতোই: মুফতি মেন্কআধ্যাত্মিকভাবে যদি আমরা আমাদের আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাই, তবে এই বাহ্যিক শারীরিক সুস্থতা দিয়ে আমাদের কী লাভ হবে? আপনি যখন ঘর থেকে বের হন, তখন কি আপনি বলেন না, আল্লাহর নামে বের হচ্ছি এবং আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখছি? এরপরই তো আপনি দরজায় তালা লাগান। আপনার যা যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা অবশ্যই নেবেন, কিন্তু মনে রাখবেন যে সাফল্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
Advertisement
সূত্র: ইউটিউব, দ্যা গাইডেড পাথ
ওএফএফ