সাধারণত মার্চ-এপ্রিল তরমুজের মৌসুম। সেই মৌসুম শেষ হওয়ার অনেক পর জুলাই মাসেও কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মাঠজুড়ে ঝুলছে পরিপক্ব তরমুজ। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শে অসময়ের ব্ল্যাক কুইন জাতের তরমুজ চাষে সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের ঘাগড়া গ্রামের কৃষকেরা। ভালো ফলন ও বাজারে বেশি দামের কারণে লাভের হাসি ফুটেছে তাদের মুখে।
Advertisement
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু ঘাগড়া গ্রামেই প্রায় ৩০ জন কৃষক পাঁচ একরের বেশি জমিতে অফ-সিজনের ব্ল্যাক কুইন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। মৌসুমের বাইরে উৎপাদিত হওয়ায় বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি তরমুজ প্রায় ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে অধিকাংশ কৃষকই খরচের তুলনায় কয়েকগুণ লাভের আশা করছেন।
এক কৃষকের সফলতা, বদলে যাচ্ছে গ্রামের চিত্রঘাগড়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন (৪৫) এ বছর প্রায় ৮২ শতাংশ জমিতে ব্ল্যাক কুইন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকসহ তার মোট উৎপাদন ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তিনি জানান, গত বছর মাত্র ১৭-১৮ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে তরমুজ চাষ করে প্রায় ৯০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ করেছেন।
আরও পড়ুন চাঁদপুরে ৭৫ জাতের বিদেশি আম চাষে সফল হেলাল উদ্দিনআলাউদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে অনেকেই বলেছিলেন বর্ষাকালে তরমুজ চাষ করে লাভ হবে না। কিন্তু আমি সাহস করে নিয়ম মেনে চাষ করেছি। আল্লাহর রহমতে ফলন খুব ভালো হয়েছে। বর্তমানে ক্ষেত থেকেই তরমুজ বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে আশা করছি। খরচ বাদ দিয়ে দুই লাখ টাকারও বেশি লাভ হবে। বর্ষায় জমিতে পানি জমে যাওয়ায় মাচা তৈরি করে চাষ করা হয়েছে। প্রতিটি তরমুজ নেট দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে অতিবৃষ্টিতে ফল মাটিতে পড়ে নষ্ট না হয়।’
Advertisement
আলাউদ্দিনের সফলতা দেখে আশপাশের কৃষকেরাও এখন ধানসহ প্রচলিত ফসলের পরিবর্তে লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষক মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘আগে এই জমিতে ধান চাষ করতাম। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় এবার প্রায় এক বিঘা জমিতে অফ-সিজনের তরমুজ চাষ করেছি। ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পেলে লাভবান হবো বলে আশা করছি।’
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মৌসুমের বাইরে এত ভালো তরমুজ হবে, তা আগে ভাবিনি। আমাদের এলাকার তরমুজ খুবই সুস্বাদু। বাজারেও এর চাহিদা বেশি। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।’ কৃষক রতন মিয়া বলেন, ‘ধান চাষে এখন আর আগের মতো লাভ নেই। পাশের কৃষকদের সফলতা দেখে আমিও এবার তরমুজ চাষ শুরু করার পরিকল্পনা করেছি।’
গ্রামজুড়ে নতুন সম্ভাবনাচণ্ডীপাশা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আলাউদ্দিন গত বছরও অফ-সিজনের তরমুজ চাষ করে ভালো লাভ করেছেন। তার সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষক এই চাষে আগ্রহী হয়েছেন। সরকার ও কৃষি বিভাগ সহযোগিতা অব্যাহত রাখলে এলাকায় অফ-সিজনের তরমুজ চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে।’
আরও পড়ুন ফরিদপুরে আলুবোখারা চাষ / রাগ করে কেটে ফেলেন ১৮টি গাছ, ৭টিতেই হাবিবুরের বাজিমাত কৃষি বিভাগের সহায়তায় সাফল্যঘাগড়া ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এলাকায় তরমুজের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছিল। কৃষি বিভাগের কারিগরি পরামর্শ অনুযায়ী চাষাবাদ করায় কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আলাউদ্দিনের সফলতা দেখে অনেক কৃষক এখন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। আমরা তাদের উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি।’
Advertisement
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-আলম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ হয়েছে। ঘাগড়া ও চণ্ডীপাশা এলাকায় পাঁচটি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছিল, যা সফল হওয়ায় আশপাশের কৃষকেরাও এ চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ ৩০-৪০ হাজার টাকা হলেও বিক্রি করে ১ লাখ টাকার বেশি আয় করা সম্ভব। ফলে প্রতি বিঘায় ৬০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ হয়। মাত্র ৬০-৬৫ দিনেই এ লাভ পাওয়া যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্ষাকালে গাছের গোড়া পচা রোগ প্রতিরোধে মালচিং পেপার ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, সারের সঠিক ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণে কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে অসময়ের তরমুজের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন শিমসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলের চাষ সম্প্রসারণেও কৃষি বিভাগ কাজ করছে।’
আরও পড়ুন চাকরি না পেয়ে উদ্যোক্তা হলেন নাঈম, ড্রাগনেই বাজিমাত সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলছেকৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত মৌসুমের বাইরে ফসল উৎপাদন এখন আর অসম্ভব নয়। পাকুন্দিয়ার ঘাগড়া গ্রামের কৃষকদের এ উদ্যোগ শুধু তাদের আয় বাড়াচ্ছে না বরং জেলার অন্যান্য কৃষকের জন্যও অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠছে। ধাননির্ভর কৃষি থেকে বেরিয়ে উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক ফসলের দিকে ঝুঁকলে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে; তেমনই দেশের কৃষিতেও যুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।
কেআরএম/এসইউ